ছেলেদের দুটো শক্ত শক্ত এক্সট্রা করতে দিয়ে গোপীনাথ ক্লাসরুম পায়চারী করছিলেন। এমন সময় জানালা দিয়ে দেখতে পেলেন স্কুলের ফাটক দিয়ে কবিরাজমশাই ঢুকছেন। সাথে বিশুও আছে। তাড়াতাড়ি বোর্ডে আরও শক্ত একটা অঙ্ক কষতে দিয়ে নীচে নেমে এলেন।
—‘কি ব্যাপার কবিরাজমশাই?’
কবিরাজমশাই ঝড়ো মুখে বললেন, ‘খবর খুব খারাপ। আমাদের দুঁদে গোয়েন্দা আর তার চেলাটি নিরুদ্দেশ।’ গোপীনাথ ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘গোয়েন্দা? তার মানে আমাদের সত্যরঞ্জন, আর তার শাগরেদ গবু?’
—‘হ্যাঁ হে।’
—‘কখন থেকে নিরুদ্দেশ?’
পাশ থেকে বিশু হাতজোড় করে বলল, ‘আজ্ঞে তা প্রায় সাতসকাল থেকে।’
—‘তা এতে ঘাবড়াচ্ছেন কেন? ওর মুরোদ তো জানি। দেখুন গিয়ে এতক্ষনে হয়ত ফিরে এসেছে।’
—‘না হে না। সত্যরঞ্জন প্রায়শই বিবাগী হয়, সে তো সবাই জানে। কিন্তু এবারের ব্যাপার আলাদা। বিশু নিজের চোখে ওদেরকে হরিশরাজার জঙ্গলে ঢুকতে দেখেছে। তাছাড়া শুনেওছে যে কি সব গুপ্তধন উদ্ধারের জন্য নাকি তারা বনের ভেতর যাচ্ছে।’
—‘বলেন কি?’
—‘তবে আর বলছি কি? এখন কি করা যায় বলোতো?’
—‘আচ্ছা কবিরাজমশাই, সবাই এত জঙ্গলের দিকে সেঁধোচ্ছে কেন? প্রথমে গগনবাবুর চাকর, তারপর জগা পাগলা, সবশেষে আমাদের গোয়েন্দাবাবু আর তার চেলা। বনের ভেতর সত্যই মেলা ধনরত্ন নেই তো।’
—‘ঠিক বুঝছি না হে। যাইহোক তুমি একবার চন্ডীমন্ডপে এস, আমি গাঁয়ের মাতব্বর দের খবর দিয়েছি। দারোগাবাবুকেও ডাকা হয়েছে। সবাই মিলে একবার শলা পরামর্শ করে মতলব বের করা যাবে।’
গোপীনাথ কিছুক্ষন ভেবে বললেন, ‘গোবিন্দনারায়ন বাবুকেও খবর পাঠিয়েছেন কী?’
—‘ওকেও খবর পাঠাতে হবে বলছ। কেন? তুমি কিছু সন্দেহ করছ নাকি?’
গোপীনাথ একটু হেসে বললেন, ‘সন্দেহ ঠিক নয়, অনুমান মাত্র। দেখুন কবিরাজমশাই আমি এ গঞ্জে প্রায় বিশবছর আছি। আশেপাশে কারা কেমন অবস্থাপন্ন সেসব মোটামুটি আন্দাজ করতে পারি। হরিশরাজার জঙ্গলে ধনরত্ন পোঁতা থাকলেও সেসব একমাত্র জমিদারবাড়ীরই হতে পারে। আমার আপনার এমনকি গঞ্জের আর কারোর চোদ্দপুরুষের নয়। সুতরাং গোবিন্দবাবুকে খবর দিলে এ রহস্যের কিছুটা হদিশ পাওয়া গেলেও যেতে পারে।’
কবিরাজমশাই মাথা নেড়ে বললেন, ‘ঠিক বলেছ। এমনটা আগে ভাবিনি, ঠিক আছে ওকেও খবর পাঠাচ্ছি। এই বিশু তুই দৌড়ে যা দিকিনি। গোবিন্দকে একটা এত্তেলা দে।’
বিশু ‘যে আজ্ঞে’ বলে দ্রুত বাজারচকের দিকে ছুট লাগালো।
—‘আপনি একটু দাঁড়ান কবিরাজমশাই। আমি একবার হেডমাস্টারমশাইকে বলে আসি।’
কবিরাজমশাই সম্মতিসুচক ঘাড় নেড়ে ফাটকের বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন।
গোপীনাথবাবু বেশী সময় নিলেন না। হেডমাস্টারের কাছ থেকে ওবেলার জন্য ছুটি মঞ্জুর করে বাইরে এসে দেখলেন কবিরাজমশাই কোথাথেকে একটা ভ্যান রিকশা যোগাড় করেছেন।
—‘উঠে পড়ো, জলদি পৌঁছনো চাই।’
গোপীনাথ দিরুক্তি না করে উঠে বসলেন।
এদিকে ভরদুপুরে চন্ডীমন্ডপে গঞ্জের মাতব্বররা হাজির হয়েছেন। হাঁসপুকুর স্টেশনারীর মালিক শতদল ঘোষ, হাঁসপুকুর অপেরার আবির চৌধুরী, হাঁসপুকুর কো অপারেটিভের ক্যাশিয়ার নবীন স্যান্যাল এঁরাও আছেন। উপস্থিতদের মধ্যে মৃদু জল্পনা চলছিল এই যে, হঠাৎ এমন জমায়েতের কারন কি। শতদল ঘোষ জনান্তিকে বলছিলেন এ নির্ঘাত জগা পাগলা সংক্রান্ত ব্যাপার। অপেরামালিক চৌধুরীবাবু বারবার হাতঘড়ি দেখছিলেন। তাঁকে বিকেলের ট্রেন ধরতেই হবে। ক্যাশিয়ারমশাই দুঃখু করে ব্যাঙ্কের দুরবস্থার কথা বলছিলেন। চাষাভুষোর দল যারা হাট থেকে সবজি বেচে ফিরছিল তারা এত লোকের জমায়েত দেখে উঁকিঝুঁকি মারতে লাগল।
এমন সময় গোবিন্দখুড়ো ঝড়ের বেগে চন্ডীমন্ডপে ঢুকে রোয়াকে একটা আসনপিঁড়ি টেনে নিয়ে বসে পড়লেন। শতদল ঘোষ একটু খুক খুক করে কেশে গলা সাফ করে খুড়োর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনাকেও ডেকেছে দেখছি।’
—‘ভালোই হয়েছে, আমার এমনিতেই নালিশ করার ছিল।’
জনতা একটু নড়েচড়ে উঠল। খুড়োর আবার কার উপর কিসের নালিশ কে জানে?
খুড়ো হাতপাখা খুলে হাওয়া খেতে খেতে আক্ষেপ করলেন, ‘কি ঘোর কলিটাই না পড়েছে বল দিকি?’
চৌধুরীবাবু একটু উশখুশ করে বললেন, ‘কি হয়েছে বলে ফেল্লেই হয়।’
খুড়ো একটু হুংকার দিয়ে বললেন, ‘তুমি থাম হে চৌধুরীর পো। ব্যাপার হয়েছে আমার মাথা। আমি এর বিহিত চাই। আমার বাড়ীতেই কিনা সব হাত পাকাবি, পুজোপাব্বনে আমার কাছ থেকে সিকিটা মুলোটা নিয়ে যাবি, আর উপগার করতে বললেই দে দৌড়। এমনকি এতই লাটসাহেব যে কানে কথাই তুলতে চায় না সব।’
শতদল ঘোষ একটু অবাক হয়ে বললেন, ‘কার কথা বলছেন বলুন তো।’
‘চোরের দল সব’, খুড়ো বলতে লাগলেন, ‘বুঝলে মুদির পো। অস্বীকার করুক দেখি ওরা। আমার বাড়ীতে হেথা হোথা সিঁদ কেটে বাবুরা সব টেনিং নেবেন। ভাঁড়ার ঘরের চাতাল থেকে মেঝেতে লাফ দিয়ে পড়ে প্যাক্টিস হবে। ওদের উৎপাতে একটু আমসত্ত্ব খাব তার জো নেই। আর শেষমেশ কিনা আমারি পুঁইমাচা লন্ডভন্ড করে দিয়ে পালায়। রীতিমতো রসিদ কেটে ইউনিয়নের চাঁদা অবধি নেয় জানিস।’
শতদল ঘোষ কিছুক্ষন হাঁ করে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘আপনি চুরিচামারির ট্রেনিং দেন?’
খুড়ো বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘আহা আমি কেন টেনিং দেব বাপু। অতবড় বাড়ি, নাহয় পেটের দায়ে ওরা নিজেরাই একটু কাজে লাগাবে, এই ভেবেই তো রফা হয়েছিল। আর লুটের বখরাও আমি কমসমই নিই। কিন্তু ব্যাপার তো তা নয়। কী রোয়াব সব। আবার আমার সাধের বাপদাদার আমলের ফুলদানীটাও গেল। ভাবতে পারিস তোরা, চোর হয়ে ঘরাঞ্চি বেয়ে উঠতে গিয়ে আছাড় খায়। রামোঃ।’
এদিকে গঞ্জের মেলা লোক জড়ো হয়ে গেছে। ভিড় ঠেলে গোপীনাথ আর কবিরাজমশাই চন্ডীমন্ডপের দিকে এগিয়ে এলেন। ওঁরা কতক্ষন এসেছেন কেউ লক্ষ্য করেনি। খুড়ো অবশ্য তখনো তিরিক্ষে হয়ে বলে চলেছেন, ‘আরে থাম না বাপু। মেলা গোল করিস না। হ্যাঁ, তারপর যা বলছিলাম, এই তো গত রাতের কথা। দেখি কি, কোথা থেকে আমার সাধের বৈঠকখানায় দুটো অপোগন্ড এসে জুটেছে। আমি ভাবছি এমন তো রফা নেই, বড়জোর গোয়ালঘরের ছাদ অবধি ওঠার পারমিশান দেওয়া আছে। উৎসাহের চোটে দু একটা কুশল প্রশ্ন করেছি কি করিনি তা সব পড়ি কি মরি করে ছুট লাগাল।’
সবাইকে ঠেলে সরিয়ে গোপীনাথ এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘দু জন ছিল কি?’
—‘আলবাত দুজন। আবার পকেটের নোটবই তে কি সব টোকা হচ্ছিল। অবশ্যি নীচের তলায় আরো ওদের সঙ্গীসাথী থাকলে কিচ্ছুটি অবাক হবার নেই।’
—‘তা হঠাৎ ছুটে পালাল কেন?’
—‘হতভাগাদের মতিগতি বোঝাই সার। বেশী কিছু নয়, খালি বলেছিলুম একটা উপগার করতে। কী উপগার সে সব বলা বারন।’
কবিরাজমশাই সামনে এসে বললেন, ‘দেখ গোবিন্দ। ভালো চাও তো সব খুলে বল।’
চৌধুরীমশাই হুড়ো দিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ বলে ফেললেই তো ল্যাটা চুকে যায়। সব শোধবোধ মীমাংসা হয় আবার বিকেলের ট্রেনটাও ধরা যায়।’ পাশ থেকে স্যান্যাল মশাই টিপ্পনী কাটলেন, ‘কথা চেপে রাখবেন না মশাই তাহলে গ্যাস অম্বল বুকজ্বালা বাধতে কতক্ষন। জানেনই তো এগুলো রোগ নয় রোগের উপসর্গ মাত্র।’
এসব শুনে শতদল ঘোষও বলতে লাগলেন, ‘কথা চেপে রাখা খুব খারাপ। আমার ছোটোবেলায় একবার—’
গোপীনাথ শতদল ঘোষকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘দেখুন গোবিন্দবাবু, বেশ কিছুদিন হল জগা পাগলাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তার আগে গগনবাবুর চাকর ঝিকু নিরুদ্দেশ। কানাঘুষোয় শোনা যাচ্ছে এদেরকে সব নাকি হরিশরাজার জঙ্গলে যেতে দেখা গেছে।’
খুড়োর হাতের পাখা থেমেছে। খুড়োর মুখ গম্ভীর। উপস্থিত জনতা নিজেদের মধ্যে নীচু স্বরে আলোচনা করতে লাগল। গোপীনাথ খুড়োর দিকে তাকিয়ে ধীর ধীরে বললেন, ‘আর আজ সকাল থেকে আমাদের গ্রামের একমাত্র ডিটেকটিভ সত্যরঞ্জন সমাদ্দার আর তার শাগরেদ গবুও নিরুদ্দেশ। ওদেরকেও নাকি শেষবার বনের কাছেই দেখা গেছে।’
উপস্থিত লোকজন প্রায় হতবাক। ভীড়ের মধ্যে থেকে নানান রকম কথা ভেসে আসতে লাগল। যেমন, ‘সে কি আমাদের সত্যরঞ্জনও!’, ‘আহা বড় মেধাবী ছিল’, বা ‘এখন কেই বা আমাদের কলাটা মুলোটা খুঁজে পেতে দেবে’, ‘শেষমেশ বেঘোরে প্রান দিল’ ইত্যাদি ইত্যাদি।
শতদল ঘোষ একধাপ এগিয়ে এ বিষয়ে শোকপ্রস্তাব ঘোষনা করলেন। জানা গেল আগামী রবিবার বাজার চকে তাঁর পৌরহিত্যে বড় করে শ্রাদ্ধবাসর হবে।
কবিরাজমশাই ভীড়ের উদ্দেশ্যে গলাখাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘অ্যাই, সব চ্যোপ! এখনই মারা গেছে ধরাটা ঠিক হবে না।’ তারপর খুড়োর দিকে তাকিয়ে গলা খাটো করে বললেন, ‘আমি যতদুর খবর পেলাম হরিশরাজার জঙ্গলে ওরা গেছে কিসব গুপ্তধন উদ্ধারে। এখন আমায় বলোতো গোবিন্দ, জমিদারবাড়ীর সাথে এই হরিশরাজার জঙ্গলের সম্পর্কটা ঠিক কি?’
গোপীনাথ দৃঢ় স্বরে বললেন, ‘বলে ফেলুন গোবিন্দবাবু। সব বলুন। কাল রাতের চোর দুজন কি আমাদের ডিটেকটিভ আর তার শাগরেদ? সেই সঙ্গে এটাও বলুন সেদিন আমার বাড়ীতে এসে অত শক্ত অঙ্কটা কি করে দুমিনিটে করে দিয়েছিলেন। আর ইদানীং যে শুনছি আপনি নাকি অন্ধকারেও দেখতে পান সেটাই বা কী?’
খুড়ো মুখ গোঁজ করে উত্তর দিলেন, ‘অঙ্কে আমি বরাবরই ভালো।’
‘আরে রাখো’, কবিরাজমশাই খেঁকিয়ে উঠলেন, ‘সামান্য শতকিয়া ধারাপাত মুখস্থ করতে গিয়ে হেদিয়ে যেতে, তুমি করবে অঙ্ক। ভালো চাও তো সব বলে ফেল না হলে দারোগা দুগ্ধবরনকে খবর দেওয়াই আছে।’
ঠিক এমনি সময় হেলতে দুলতে দুজন কনস্টেবল সমেত দারোগা দুগ্ধবরন চন্ডীমন্ডপে দোরগোড়ায় হাজির হলেন। তাঁকে আগে থেকে খবর দেওয়াই ছিল। যদিও দ্বিপ্রাহরিক দিবানিদ্রা ভঙ্গ করে আসতে তাঁর একটুও ইচ্ছে ছিল না। তবে কিনা কবিরাজমশাইয়ের কথা তিনি চট করে ফেলেন না। তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও হাজির হয়েছেন।
কনস্টেবল দুজন লাঠি দিয়ে ‘অ্যাই হ্যাট হ্যাট’ বলতে বলতে সব্বাইকে ঠেলে সরিয়ে যাওয়ার রাস্তা করে দিল। দারোগাবাবু সোজা চন্ডীমন্ডপের রোয়াকে বসে জামার বোতাম খুলে জিরোতে লাগলেন। ব্যাপার স্যাপার দেখে খুড়োর দিকে আড়চোখে চেয়ে কবিরাজমশাই বললেন, ‘দেখ গোবিন্দ বেশী দেরি হবার আগেই সব খুলে বল, কে জানে হয়ত বাছাদের প্রানটুকু বাঁচানো যাবে।’
খুড়ো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
গোপীনাথ নিচু স্বরে খুড়োর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হরিশরাজার জঙ্গলে কি জমিদারবাড়ীর লুকোনো ধনরত্ন পোঁতা আছে? থাকলেও সেটা কোথায়? তাছাড়া ওখানে কী আছে যে লোকজন বেবাক লোপাট হয়ে যায়। ঐ জঙ্গল নিয়ে এতসব গল্পকথার কারন কি গোবিন্দবাবু?’
খুড়ো আবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এবার দুগ্ধবরন সাধাসাধি করতে লাগলেন। ‘বলুন না, আপনার কী সব বলার আছে, আরে মশাই মেডেল পাইয়ে দেব!’, ‘আপনি কি সব ভালো লোক খুঁজছেন তাও দেব’ ইত্যাদি। এমনকি অসভ্য কনস্টেবলগুলো পর্যন্ত এসে লাঠির খোঁচা মেরে ইয়ে দেঙ্গে উয়ো দেঙ্গে করতে লাগল।
শেষমেশ আর থাকতে না পেরে খুড়ো গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। সবাই উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। খুড়ো সবাইকে একবার দেখে নিয়ে, গলা কেশে ঝেড়ে সাফ করে ধীরে ধীরে বললেন, ‘জঙ্গলের ভেতর পাথরগুহার মধ্যে একখানা ঘড়ি আছে। বালিঘড়ি।’
প্রথমদিকে সবাই কে কী বলবে ভেবে পেল না। তারপর ভীষন রকম হট্টগোল শুরু হল। স্যান্যাল মশাই বলতে লাগলেন, ‘আরে ছোঃ, একটা কবেকার পুরোনো বালি ঘড়ি তারই জন্যে সব হেদিয়ে মরছে। আরে ঘড়ির কালেকশন দেখতে চান তো সোজা কুমিরমারিতে আমার সেজ পিসেমশায়ের বাড়িতে যান। হেন ঘড়ি নেই ওনার কালেকশনে, এমনকি ঠাকুরদাদার আমলের চেন দেওয়া ঘড়ি পর্যন্ত।’
ভীড়ের মধ্যে গগনবাবুর পিসীমা উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলে উঠলেন, ‘কেন আমাদের কাশীতে যে ঘড়িবাবা ছিলেন, উনি কী কম ঘড়ির খবর জানতেন নাকি? যে পাশে গিয়ে বসত সেই শুনতে পেত সারাক্ষন টিকটিক টিকটিক করে আওয়াজ হচ্ছে।’
এমনি করে আরো অনেকের কতরকম ঘড়ির কাহিনী বেরোতে লাগল। শতদল ঘোষই বা কম যাবেন কেন, তিনিও বলতে লাগলেন, ‘ইস! আমাদের সরখেল মশাইয়ের ঘরের ঘড়িটা যদি—’
গোপীনাথ রোয়াকের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বললেন, ‘খামোশ!’
সব্বাই ফের চুপ মেরে গেল। গোপীনাথ খুড়ো মশায়ের দিকে তাকিয়ে কঠিন স্বরে বললেন, ‘বালিঘড়িটা দিয়ে কী হয় গোবিন্দবাবু? ওটা ওখানেই বা রাখা কেন?’
খুড়ো খানিক চুপ করে থেকে ঘুম ঘুম স্বরে বলতে লাগলেন, ‘ওটাই তো হল ইমেৎ! ওটাকে উলটে দিলেই তো ফের আমার খসরুৎ হবার কথা। পাছে যাতে ভুল করে কেউ উলটে না দেয় তাই তো ওটা অমন করে লুকিয়ে রাখা আছে।’
গোপীনাথ হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন, আর সব লোকজনও তাই। হঠাৎ খুড়ো ধড়ফড়িয়ে উঠে বলতে লাগলেন, ‘এসব আমার কিচ্ছুটি মনে নেই বিশ্বাস কর তোরা।’
কবিরাজমশাই অবাক হয়ে বলে উঠলেন, ‘এসব কি বলছ হে গোবিন্দ? ইমেৎ, খসরুৎ এসব কী ফুরুৎ ফারুৎ করছ?’
খুড়ো দুঃখী দুঃখী মুখ করে বললেন, ‘আমিই কি ছাই বিশ্বাস করতাম। কবে সেই দাদামশাই, বাপ জ্যেঠারা বলত, আমল দিতাম না। বাপ হরিশরাজার জঙ্গলে নিখোঁজ হওয়ার পর পিসী একদিন বুঝিয়েছিল। মনেও ধরেছিল সেসব কথা। তা তেনারা গত হওয়ার পর গত বিশ বছরে একটিবারের জন্যেও টেরটি পাইনি। হঠাৎ করে একদিন ঐ জগু হতভাগা দিল সব চৌপাট করে। রাতের বেলা সব পষ্টাপষ্টি দেখতে লাগলুম। উঃ সে কি আপদ। পাছার দিকে অযথা সুড়সুড়ি আরম্ভ হল, বেশ বুঝতে পারলুম ল্যাজ বেরোতে চলেছে। লম্বা লম্বা লাফ দিয়ে দিব্যি খাল নালা টপকে যেতে পারছি। আরো নানারকম সব অশৈলী ব্যাপারস্যাপার। প্রথম প্রথম খুব ফুর্তি হল, তারপর বেজায় ভয় ধরল। পুরোনো বইখাতা সব আঁতিপাতি করে খুঁজে শেষে একখানা নকশাতে হদিস পেলাম কোথায় ইমেৎখানা রাখা আছে। সেই ইস্তক একখানা ভালো নির্লোভ লোক খুঁজে বেড়াচ্ছি। এখন আমার দোষ কি তাই তোরা সব বল?’
ভিড়ের মধ্যে সবাই বেবাক হয়ে শুনে যেতে লাগল। দুগ্ধবরন অনেকক্ষণ ঘাড় উঁচু করে খুড়োর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ঘাড় টনটন করে উঠলেও খুড়োর মুখের উপর থেকে চোখ সরাতে পারছেন না। কবিরাজমশাই বহুক্ষন আগে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছেন।
গোপীনাথ কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন, ‘আপনি কি মানুষ নন?’
—‘না রে দাদা। ওইখানেই তো যত গন্ডগোল। শোন তবে খুলেই বলি, প্রায় পাঁচপুরুষ আগে কি সব অং বং চং গ্রহ থেকে এই খানে এসে আমরা পড়ি। গ্রহটার খটমট নাম আমি বলতে পারি না বাপু, তবে এটুকু শুনেছি কিসব দাঙ্গা হাঙ্গামার ভয়ে আমাদের পূর্বপুরুষ পালিয়েছিলেন। ওঁদের নামে হুলিয়া জারি হয়েছিল। পাছে কেউ খুঁজে ফেলে ওইজন্যে আমার ঠাকুরদার ঠাকুরদা কিসব কলকাঠি নেড়ে এই তোদের মত ভেক ধরার উপায় বার করেন। ঐ বালিঘড়ি টাই তো সেই চাবিকাঠি। ওটাকে উলটে দিলেই আবার ফের মানুষ থেকে খসরুৎ হবার কথা।’
খুড়ো চুপ করলেন। গোপীনাথ হতবাক। শতদল ঘোষ ইতোমধ্যে দুবার হাঁ করে থাকার দরুন মাছি গিলে ফেলেছিলেন। একটু ধাতস্থ হয়ে একগাল হেসে বললেন, ‘বেড়ে গল্পটা বানিয়েছেন যা হোক। এটা নিয়ে যাত্রাপালা কর যায় না চৌধুরীবাবু?’
খুড়ো তেরিয়া হয়ে বললেন, ‘তোমার এটা গল্প মনে হচ্ছে, ধুতি খুলে ছোট্ট ল্যাজখানা দেখাব নাকি? নাকি একবার লাফ মেরে দেখাব? এই তোমাদের মতো বুদ্ধুদের দেখলেই রাতের বেলা পেসার বেড়ে আমার মুন্ডু দিয়ে সবযে আলো বের হয়।’
শতদল সভয়ে পিছিয়ে গেলেন। স্যান্যাল মশাই ডুকরে উঠে শিবস্ত্রোত্র জপ করতে লাগলেন। ওদিকে ভীড়ের মধ্য থেকে কারা সব ‘ঐ আসছে, সব্বাইকে জবাই করবে’ বলে চেঁচাতে লাগল। লোকজন সব দেখে শুনে ভয়ের চোটে বাজারচকের গলি ধরে যেযার মতন সরে পড়তে লাগল। কিছুক্ষনের মধ্যেই চন্ডীমন্ডপ প্রায় ফাঁকা, শুধু দারোগাবাবু আর তাঁর দুই উড়িয়া পুলিশ, গোপীনাথ, কবিরাজমশাই, গোবিন্দখুড়ো আর শতদল ঘোষ পড়ে রইলেন। অবশ্য দারোগাবাবু ইতোমধ্যে বসে বসেই মুচ্ছো গেছেন। সেটা দেখে কনস্টেবল দুজন একটু দূরে বসে তাদের দেশ গাঁ এর বাতচিত করতে লাগল।
কবিরাজমশাই অপলক চোখে খুড়োর দিকে তাকিয়ে রইলেন। অস্বাভাবিক কিছু ব্যাপার যে ঘটছে সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত ছিলেন, কিন্তু তা বলে এসবের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না। গোবিন্দ হয়ত মিথ্যে বলছে না কিন্তু তাঁর ছোটবেলাকার বন্ধু, এত কাছ থেকে যাঁকে দেখেছেন সে যে একটা দস্তুরমত ভিনগ্রহী অমানুষ জীব এ ভাবতে তাঁর কেমন আসোয়াস্তি হচ্ছিল। খুড়োর দিকে তাকিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘ব্যাপারখানা যে এখনো ঠিক বুঝছি না হে গোবিন্দ। তাছাড়া এর মধ্যে জগা পাগলাই বা কী করে আসে।’
খুড়ো বিমর্ষ মুখে বললেন, ‘এ সব অতি গুহ্য কথা হে। তোমাদের বলা ঠিক হচ্ছে না। নেহাত এতগুলো লোকের প্রানের ব্যাপার তাই বলছি। হরিশরাজার জঙ্গলে আমার পুর্বপুরুষেরা তুক করে রেখে গেছেন। ঐ বালিঘড়ি যাতে কেউ ভুল করেও কেউ উল্টে না দেয় তার জন্যেই সেসব ভয়ংকর ব্যবস্থা। সেসব এড়িয়ে হতভাগা পাগলটা কি করে জানি ঠিক সেই কাজটাই করেছে সবার অজান্তে। তাই তো আমার এই অবস্থা। আর বেশীদিন চললে পুরোপুরি খসরুৎ বনে যাব আর তখন কি করে মৌরলা মাছের ঝোল খাব বল আর আমার দুধেল গরুটারই বা কী হবে?’ খুড়ো ডুকরে উঠলেন।
গোপীনাথ উপর্যুপরি বিস্মিত হচ্ছিলেন। যেসব ভিন গ্রহী প্রানীদের কথা গল্পের বইতে এত পড়েছেন, যাদের খোঁজ কেবল সায়েবসুবোরাই পায় সেইরকম জলজ্যান্ত একজন চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কেবল দেখে কিচ্ছুটি বোঝার উপায় নেই। একবার ছুঁয়ে দেখবেন নাকি?
কবিরাজমশাই রোয়াকে বসে পড়লেন। দারোগা দুগ্ধবরনের মুচ্ছো এখনো ভাঙ্গেনি। সেদিকে আড়চোখে দেখে খুড়োকে প্রশ্ন করলেন, ‘তাহলে বনের ভেতর ধনরত্ন কিছু নেই, খালি তোমার ওই কিসব ইমারৎ না কি সব আছে? তাহলে ওরা বনের ভেতর ঢুকল কেন?’
—‘ইমারৎ নয় ইমেৎ। আর ধনরত্ন আলবাত আছে। বনের ভেতর সোনার মোহর হাজার খানেক মতন রাখা। তবে পাওয়া অত সহজ নয়। নকশাটা যদিওবা ওরাই চুরি করে থাকে তাহলেও ও জিনিস পাওয়া ওদের কম্ম নয়। ব্যাটারা বুদ্ধির ঢেঁকি আর পয়লা নম্বরের ভীতুর ডিম।’
প্রাথমিক ঘোর কাটার পর ধাতস্থ হয়ে গোপীনাথ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আচ্ছা খসরুৎবাবু আপনাদের ইয়ে কি বলে বিজ্ঞান বুঝি খুব উন্নত?’
—‘আঃ আমার নাম খসরুৎ নয়। ও তো আমাদের জাতিটার নাম। জন্মগত নাম একটা কী বিচ্ছিরি বদখত। তাই বাপ মা আহ্লাদ করে গোবিন্দ নাম রেখেছিল। আর বিজ্ঞানের কথা আমায় শুধিয়োনা বাপু, সে সব আমি কখনো চোখে দেখিনি। খালি মাঝে মাঝে ঘুমের ঘোরে কিসব কালো কালো ছায়া ছায়া দেখি।’
বিকেল হয়ে এসেছে। চন্ডীমন্ডপে রোদের ছায়া লম্বা হচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে খুড়ো আনমনে বলতে লাগলেন, ‘তবে তোদের এইখানটাই বা কী কম সুন্দর বল। কেমন সুন্দর সব মানুষজন, খাসা তরিতরকারি খাবারদাবার, গঞ্জের হাটে শিবুর দোকানের জিলিপি, আমার বাগানের বাতাপিনেবু, বর্ষাকালে অমন সুন্দর পয়সাফুলের ঝোপ, এসব ছেড়ে ওরকম বিচ্ছিরি একখানা খসরুৎ বনতে কি ইচ্ছে করে রে বাপ? কেউ যদি ঘড়িখানা একবার উল্টে দেয় তো বাঁচি।’ বলতে বলতে খুড়োর গলা ধরে এল। কোঁচার খুঁটে চোখ মুছলেন।
শতদল ঘোষ উৎসুক হয়ে বললেন, ‘তা আপনি নিজে গেলেই তো পারেন।’
—‘সেইখানেই তো মুশকিল রে ভাই। ঐ যে বললাম না ঠাকুরদার ঠাকুরদা সব তুকতাক করে গেছেন। বালিঘড়ির পাশে মোহরের বস্তা কি আর এমনি এমনি রাখা। বাপ আমার ঐসবের খোঁজে গিয়েই তো মলো।’
গোপীনাথ ধাঁধাটা বুঝতে পারলেন না।
খুড়ো রোয়াক থেকে নেমে গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘শোনো সকলে। হরিশরাজার জঙ্গলে কেউ যদি রুয়াৎ এর খপ্পরে পড়ে তবে তা থেকে কাউকে উদ্ধার করে আনা মুশকিল। বেলা পড়ে এসেছে, এখনই বেরোতে হবে। ঐ দারোগাটাকে টেনে তোলো। একবার চেষ্টা করে দেখা যাক।’
দারোগা দুগ্ধবরনকে কনস্টেবল দুটো তাদের জুতো শুঁকিয়ে জ্ঞান ফেরাল, কিন্তু পরক্ষনেই জঙ্গলে যেতে হবে শুনে তিনি ফের মুচ্ছো গেলেন। খুড়ো সেদিকে চেয়ে বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘অকর্মার ঢেঁকি! যাকগে ওকে ছাড়াই চল সব। পুলিশ দুটো থাক, বরং ওকে পাহারা দিক।’
এদিকে শতদল ঘোষ চন্ডীমন্ডপ থেকে একটা পাকা বাঁশের লাঠি জোগাড় করেছেন। তা দেখে খুড়ো বললেন, ‘ওই বুদ্ধি নিয়েই থাক। রুয়াৎ কি যে সে জিনিস রে। ওই লাঠি দিয়ে কি আর সে সব সামলানো যায়?’
গোপীনাথ দুর্বল স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কিন্তু সেটা কী গোবিন্দবাবু? আর সেটা থেকে ভয়টাই বা কী। জগা পাগলা যেতে পারলে আমরা পারবো না কেন? তাছাড়া সত্যরঞ্জন আর গবু কে ওই অত বড় জঙ্গলে কোথায় খুঁজব?’
খুড়ো কাষ্ঠহাসি হেসে বললেন, ‘রুয়াৎ কি জিনিস তা আমি বিশদে জানি না, তবে কিছু কিছু জানি। সে সব যেতে যেতে বলছি। তবে ওরা রুয়াৎকে ফাঁকি দিয়ে যদি বেরোতে পারে তাহলে কোথায় ওদের শেষমেশ পাওয়া যাবে আমি জানি। চল তোমাদের সেখানেই নিয়ে যাব।’
কবিরাজমশাই চন্ডীমন্ডপের কালীমূর্তিকে একবার প্রনাম করে নিলেন। রোয়াকে দারোগা দুগ্ধবরনের মুচ্ছো তখনো ভাঙেনি। চারজনে রওনা দিলেন। রোদ বেশ পড়েছে। গোবিন্দখুড়োকে একটু তফাতে রেখে বাকি তিনজন গা ঘেঁষাঘেঁষি করে চলতে লাগলেন।
চন্ডীমন্ডপের আড়াল থেকে বিশু বেরিয়ে এসে ওঁদের চলে যাওয়া দেখল, তারপর অম্ফুট স্বরে বলল, ‘দুগগা দুগগা।’
No comments:
Post a Comment