Sunday, 31 July 2011

হরিশরাজার জঙ্গলে- পর্ব ৯

হরিশরাজার জঙ্গল বেশ ঘন। হরেক রকমের ফল-পাকুড়ের গাছ, বড় বড় গুঁড়িওলা বট গাছ, অ্যাশশ্যাওড়া, অশ্বথ্থ, শাল ইত্যাদিতে ভর্তি। বনের ভেতর দিনের বেলা সূর্‍যের আলো প্রায় পড়েই না। তাই ভরদুপুরেও চারিদিক আধো অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে থাকে। জঙ্গলের ভেতর মাঝেমাঝে কিছু নিচুমতন জলা রয়েছে। ছোটখাটো বন্যজন্তুরা সেখানে জল খেতে আসে। ব্রিটিশ আমলে বনের ভেতর একটা বাংলো মতন তৈরী হয়েছিল। লোকযাতায়াত করত। সায়েবরা পাততাড়ি গোটানোর পর বাড়িটা কবে আগাছায় ঢাকা পড়ে গেছে। ছোটখাটো শুঁড়িপথ বেয়ে বনের ভেতর বেশ খানিকটা যাওয়া যায়, তারপর কাঁটাঝোপ আর বুনোলতাপাতার ঠাসবুনোট ভেদ করে আরও এগোনো মুশকিল। জঙ্গলের উত্তর দিকের প্রান্ত বেয়ে নদী বয়ে গেছে। অবশ্য বর্ষাকাল ছাড়া আর অন্য কোনো সময় জল থাকে না।
     জঙ্গলের সামনে এসে একটা শিরীষ গাছের তলায় সত্যরঞ্জন বসে পড়লেন। গবুও তাঁর পাশে ঠ্যাং ছড়িয়ে বসে পড়ে হাঁপাতে লাগল। চারিদিক ভীষন নিঝঝুম, খালি ঝিরঝিরে হাওয়ায় গাছের পাতায় সরসরানি আওয়াজ আর বনের ভেতর থেকে একটানা ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে। রোদ বেশ বেড়েছে যদিও বনের ভেতরে তা বুঝবার উপায় নেই। আড়চোখে জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে গবুর গা শিরশির করে উঠল, কী ভয়ংকর সব ঘাপটি মেরে আছে কে জানে?
সত্যরঞ্জন নোটবইয়ের ভেতর থেকে নকশাটা বার করলেন। খানিকক্ষন ভালো করে দেখে একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, ব্যাপারখানা যত সহজ ভেবেছিলাম ততটা নয় বলেই মনে হচ্ছে।
কেন কেন?
­—তুই যে বলেছিলি বনের ভেতর নাকি সিংহের গুহা আছে, ওর ভেতরেই নাকি সব হীরে মানিক, খুড়ো নাকি সেখানে বসে আঁক কষে, কই সেসবের তো কিছু হদিস নেই।
ইয়ে তাই তো শুনেছিলুম।
ভুল শুনেছিলি। সব্বাই জানে হরিশরাজার জঙ্গলে বাগ-সিংগি ওসব কিছু নেই। সিংহের গুহা নয় রে বোকা ওটা পাথরগুহা হবে। বনের একদম ভেতরে এই দ্যাখ নকশায় হদিস দেওয়া আছে। ওর ভেতরেই মনে হয় সব আছে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে অন্য জায়গায়।
গবু নকশাটার উপর একটু ঝুঁকে পড়ে বলল, আবার কী?
সত্যরঞ্জন নকশাটার দিকে চেয়ে অন্যমনস্ক ভাবে বললেন, যাওয়ার রাস্তা আর ফেরবার রাস্তাটা একনয় কেন বলত? আটকাচ্ছে কিসে? তাছাড়া ফেরবার রাস্তায় অমন অদ্ভুত গোল্লা পাকানো কেন?
—‘তাই তো!’
খানিকক্ষন ভাবার পর মাথামুন্ডু কিছু না পেয়ে সত্যরঞ্জন নকশাটা গুটিয়ে নিয়ে বললেন, ‘চল যাওয়া যাক, যা থাকে কপালে।’
     দুজনে মিলে বনের ভিতরে ঢুকলেন। অপ্রশস্ত বনপথ ধরে পাশাপাশি দুজনে মিলে হাঁটা যায় না। আগুপেছু করে হাঁটতে হয়। বিশাল বড় উঁচু উঁচু সব গাছ। তার লতাপাতা ডালপালায় আকাশ প্রায় ঢাকা পড়ে গেছে। মানুষ সমান উঁচু বুনো ঝোপ। কিছু একটা ভাবে ওরই মধ্যে কোনরকমে হাঁটার মতন পথ তৈরী হয়েছে। দুজনে মিলে সন্তর্পণে এগুতে লাগলেন।
     নকশায় একটা বেশ চওড়া খালের উল্লেখ আছে। সুর্মাখাল। আগে হয়তো নদীর সাথে যোগ ছিল। এতবছর পরে শুকিয়ে হয়ত হেজে মজে গেছে। আগে ঐটি খুঁজে বার করতে হবে।
     গবু একটা বড়সড় পেয়ারা গাছের ডাল ভেঙ্গে সপাত সপাত করে দুধারের ডালপালা ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে এগোতে লাগল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাখিদের  কিচিরমিচির বেড়েছে। বনের ভেতর প্রচুর টিয়াপাখি। এত টিয়াপাখি কেন রে বাবা? বেশ কিছু বাঁদর গাছের ডাল বেয়ে লাফালাফি করছে। ওদেরকে চোখ গোলগোল করে দেখতে লাগল। গবু দেখল একরকম গাছের বেশ মোটা গুঁড়ি, তবে তার গায়ে কেমন সব খোঁচা খোঁচা কাঁটা দেওয়া। তবে কাঠবেড়ালীরা সেসবের উপর দিয়েই দিব্যি যাতায়াত করছে। বন যেখানে একটু কম ঘন সেখানে প্রচুর বুনো অর্কিড ছড়িয়ে আছে। বেশ কিছু ঝোপের ভেতর কেমন সব জ্বলজ্বলে চোখ। খরগোশ না সজারু কে জানে?
     সত্যরঞ্জন মাঝে মাঝে নকশায় চোখ রাখছিলেন। সে জন্য দুতিনবার বুনো লতাপাতায় পা জড়িয়ে আছাড় খেয়েছেন। পরনের কাপড় ছিঁড়ে ফর্দাফাঁই। কোনরকমে সামলে সুমলে চলছেন।
     ঘন্টাখানেক চলার পর গাছের ফাঁক দিয়ে একটা নালা মতন চোখে পড়ল। সেই সঙ্গে মৃদু ঝরনার কুলুকুলু শব্দ। সত্যরঞ্জন তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে দেখলেন নালাই বটে। ছোটবড় অসংখ্য নুড়িপাথরের উপর দিয়ে জলের মৃদু স্রোত। পা দিলে গোড়ালি অবধি ডুবে যায়। দুপাশের সারিসারি গাছের মাঝখান দিয়ে নালাটা এঁকেবেঁকে গেছে। নালার ধারের ভিজে মাটিতে জন্তু জানোয়ারের ছোট ছোট পায়ের ছাপ। শেয়াল জাতীয় কিছু বোধহয় রাত্রে জল খেতে আসে। স্বচ্ছ জল। দুজনে মিলে আঁজলা ভরে খানিক জল খেলেন। দূরে জলের স্রোতের ওপর আলো পড়ে চিকচিক করছে।
—‘এই কি তবে সেই সুর্মাখাল?’
—‘হবে হয়তো।’
তাহলে নির্দেশ অনুযায়ী আমাদের স্রোতের দিক বরাবর হাঁটতে হবে, সামনে গেলে নালাটার দুভাগে ভাগ হবার কথা, সত্যরঞ্জন কোঁচার খুঁট দিয়ে মুখ মুছলেন।
কোন রাস্তা দিয়ে এলাম তা মনে রেখেছিস?
আজ্ঞে খুব একটা জটিল নয়। মনে হয় চিনতে পারব।
তবু সাবধানের মার নেই, কিছু একটা চিহ্ন দিতে দিতে এগোতে হবে।
যে আজ্ঞে।
দুজনে মিলে ফের নালার পাশ দিয়ে সতর্কভাবে এগোতে  লাগলেন। গবু মাঝে মাঝে দুহাত অন্তর কোন বড় গাছের গুঁড়িতে তীক্ষ্ণ কিছু দিয়ে লিখতে লাগল।
আরো কিছুদুর এগোনোর পর সত্যসত্যই দেখা গেল সুর্মানালা সামনের দিকে দুভাগ হয়ে গেছে। সত্যরঞ্জন উত্তেজিত হয়ে বলতে লাগলেন, দেখেছিস! হুবহু যেমন নকশাতে আছে, ঠিক সেইরকম।
গবুর উত্তেজনায় চুল খাড়া খাড়া হয়ে গেল, ওইখানেই আছে বুঝি!
আরে না না, আরো যেতে হবে, তবে বেশীদুর আর নয়।
নালা যেখানে দুভাগে ভাগ হয়েছে সেখানে এসে সত্যরঞ্জন ফের নকশাটা খুলে বসলেন। একটা ত্রিকোনাকৃতি জায়গা নালাটাকে দুভাগে ভাগ করেছে। ডানদিকের শাখা বেয়ে কিছুদুর এগোনোর পর ম্যাপের উপর একটা বড়সড় গোল দাগ। পাশে একটা ঘন্টার ছবি আঁকা। ঘন্টা কেন? মন্দির আছে নাকি?
গবু দেখে বলল, খুড়ো আর জগা পাগলা মিলে ঘন্টার কথা কিসব বলছিল বটে।
তাই নাকি!
তবে আর কি, মার দিয়া কেল্লা। এবার পাকা আমের মতন পেড়ে নেব।
দুজনে মিলে তাড়াতাড়ি নালা বরাবর এগোতে লাগলেন। গবুর অবশ্য মাঝেমাঝে একটু দেরী হচ্ছিল গাছের গায়ে লিখতে গিয়ে। বেশ কিছুদুর এগোনোর পর সামনে নালার পাড় ঘেঁসে একটা নিচু ঘাসজমি দেখাগেল। পাড় বেয়ে উঠে গুটিগুটি পায় সেখানে এসে দুজনে মিলে হাত পা এলিয়ে শুয়ে পড়লেন। মখমলের মত সবুজ নরম ঘাস। এই দূর্গম বনের ভেতর হঠাৎ করে এরকম ঘাসজমি কোথা থেকে গজিয়ে উঠল তা ভেবে অবশ্য গবু একটু অবাক হচ্ছিল।
ঘাসজমিটা আরো ঢালু হয়ে যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকে আবার বনের শুরু। বেলা বেশ বেড়েছে। হয়তো দুপুর এখন। গবুর বেশ খিদে খিদে পাচ্ছিল। আসার পথে একটা পেয়ারা গাছ থেকে বেশ কিছু পেয়ারা পেড়েছিল, সেসব কখন খাওয়া হয়ে গেছে। দূরে একটা বড় শিংশপা গাছে প্রচুর বাঁদর বসে রয়েছে। সেদিকে তাকিয়ে গবুর কেমন ঘুম ঘুম পেতে লাগল।
সত্যরঞ্জন আধশোয়া অবস্থায় বললেন, এতদুর চলে এলাম কই সেরকম ভয়ের তো কিছু দেখতে পেলাম না। বুঝলি বনটা একটু দুর্গম এই যা। লোকে অপদেবতা আছে বলে গুজব রটায়। সাত রাজার ধন নিয়ে ফেরার পর দেখবি লোকের ভয় কেটে গেছে। রাতারাতি এসব তখন ট্যুরিস্ট স্পট হয়ে যাবে। হামেশাই তখন বনের ভেতর পিকনিক বসবে। কলাপাতার থালায় মোহনভোগ খিচুড়ি, বেগুনভাজা আর শেষপাতে শিবু ময়রার রসবড়া।
এসব শুনে গবুর আরো খিদে পেয়ে গেল, উৎসাহী হয়ে বলতে লাগল, হ্যাঁ হ্যাঁ, ওর সাথে আমসত্ত্বর চাটনী আর দই থাকলেই বা ক্ষতি কী। কিংবা ধরুন—
গবু আরো কিসব বলতে যাচ্ছিল। সত্যরঞ্জন মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে কান খাড়া করে কি যেন শুনতে লাগলেন। কোথাও দূরে একটা ঘন্টা বাজল  মনে হচ্ছে।
একটু পরে দুজনেই বেশ পরিস্কার শুনতে পেলেন দূরে কোথাও যেন ঢং করে ঘন্টা বাজল। সত্যরঞ্জন তাড়াতাড়ি ট্যাঁক থেকে নোটবইটা বার করে নকশাটা দেখতে লাগলেন। যেদিকে যেতে হবে মনে হচ্ছে সেদিক থেকেই ঘন্টার আওয়াজটা আসছে। বেশ বড়সড় কোনো ঘন্টা বোধহয়, কেননা সে আওয়াজের রেশ থাকছে অনেকক্ষন।
তাড়াতাড়ি চল। কুইক। বেশ কাছাকাছি এসে পড়েছি মনে হচ্ছে।
গবু তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। শিংশপা গাছে বাঁদরগুলো কেমন ভয় পেয়ে লাফালাফি করছে। সেদিকে চেয়ে গবুর অসোয়াস্তি হল। পায়ের তলাটা কেমন শিরশির করছে। ঘন্টাটা বাজাচ্ছে কে? আবার কোন সবুজ মুন্ডুওলা ভুত নয়ত? ওঁদের খপ্পরে একবার গিয়ে পড়লে আর রক্ষে আছে! গতরাতে কোনওমতে পালিয়ে বেঁচেছে। ঘুঘু তো আর বারবার ধান খাবে না। কী দরকার রে বাবা এইসব গুপ্তধনটন খুঁজে, তার চেয়ে আয়েশ করে ক্লু খোঁজাতেই বেশি আনন্দ।
সত্যরঞ্জন ইতোমধ্যে একটু এগিয়ে গেছেন। ঘাসজমি শেষ হয়ে যেখানে বন ফের শুরু হচ্ছে সেখানে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বললেন, কোথাও একটা নিশেন দিয়ে রাখ। ফেরবার পথে চিনে ফিরতে সুবিধা হবে। 
যে আজ্ঞে, বলে গবু ফের ঘাসজমি পেরিয়ে নালাটার দিকে চলল। নালার পাড় ঘেঁসে একটা বড়সড় জারুল গাছ দেখেছে। ওর গায়েই একটা বড়বড় করে লিখে আসা যাক।
ঘাসজমির শেষে এসে গবু ভীষন জোর আঁতকে উঠল। নিজের চোখকে অবধি বিশ্বাস করতে পারছে না। নালাটা! ওই অতবড় নালাটা কোথায় গেল! এই তো এইমাত্র হাঁচোড়পাঁচোড় করে দুজনে মিলে পাড় বেয়ে উঠেছে। জারুলগাছটাই বা কোথায়। তার জায়গায় এতো বেবাক একটা বাঁশবন। গবুর হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেছে, গলা শুকিয়ে কাঠ। সে বেশ বুঝতে পারছে ফিরতে সুবিধা হবে বলে সে যত চিহ্ন দিয়ে এসেছিল সে সব এখন আর নেই। হয়তো পুরো বনটাই ওলটপালট হয়ে গেছে। এ কি করে সম্ভব?
     কিছু ভাবতে না পেরে সে ধপাশ করে ঘাসজমির উপর বসে পরল। সত্যরঞ্জন তাড়াতাড়ি দৌড়ে এলেন।
কি ব্যাপার? বসে পড়লি কেন? 
গবু কোনওমতে নালার দিকটা দেখিয়ে দিল। ঘন বাঁশবনের দিকে চেয়ে সত্যরঞ্জন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ফেরবার রাস্তা মুছে গেছে। তাঁরা এখানে বন্দী।
অনেকক্ষন পর একটু ধাতস্থ হয়ে সত্যরঞ্জন পায়চারি করতে লাগলেন। বিপদে পড়লে বড় বড় গোয়েন্দারা মাথা ঠিক রাখে। তাঁকেও মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে। নালাটার জায়গায় রাতারাতি বাঁশবন গড়ে উঠল কী করে। এরকম যে হবে সে সব তো নকশাতে বলা নেই। এই ভাবেই কী যারা হরিশরাজার জঙ্গলে ঢোকে তারা আর বেরোতে পারে না? ঘন বাঁশবনের ওপাশে কী আছে তাও দেখা যাচ্ছে না। একটু পরেই সন্ধ্যে নামবে, তখন বিপদ হয়তো আরো বাড়বে বই কমবে না। বাঁশবনের ভেতরটা একবার সরেজমিনে তদন্ত করে আসলে হয়। কোন ক্লু হয়ত পাওয়া যেতে পারে।
সত্যরঞ্জন বাঁশবনের দিকে এগোনোর উপক্রম করতেই গবু লাফ দিয়ে তাঁর পা জড়িয়ে ধরল। বেবাক ভয় পেয়ে ধপাশ করে পড়ে প্রায় কুমড়ো গড়াগড়ি অবস্থা।
এসব কি? এসবের মানে কি? দেখছিস পদে পদে বিপদ, তায় আবার এমন করে চমকে দিচ্ছিস!
আজ্ঞে ওদিকে যাবেন না কর্তা।
সত্যরঞ্জন একটু নার্ভাস হয়ে বললেন, কেন বলত?
আজ্ঞে যদি আবার এখানে না ফেরা যায়, যদি আবার সব কিছু পালটে যায়। বলা যায় না বাঁশবনে গিয়ে হয়ত দেখলেন এখানটা বেবাক পুকুর, মাঝখানে হাঁস চরছে।
সত্যরঞ্জন বিবেচনা করে দেখলেন কথাটায় যুক্তি আছে। হতাশ হয়ে বললেন, তাহলে এখন কী করা যায় বলত?
আজ্ঞে নকশাতে কিছু হদিস দেওয়া নেই?
নকশাতে? নাহ, সেরকম তো কিছু নেই।
গবু হতাশ হয়ে চুপ করে গেল। এই মহাবিপদ থেকে বাঁচবার এখন উপায় কী? গঞ্জে এতক্ষন তাদের দেখতে না পেয়ে নির্ঘাত হুলুস্থুলু পড়ে গেছে। যেসব জায়গা সাধারনত সবাই খোঁজে সেসব এতক্ষনে দেখা হয়ে গেছে নিশয়। সবাই হয়ত ধরে নিয়েছে যে তারা বরাবরের মতো দেশত্যাগী হল বোধহয়। ইস, যদি কাউকে বলে আসা যেত। অবশ্য তাতেই বা কী। হরিশরাজার জঙ্গলে কেউ ভুলেও খুঁজতে আসত না। তাছাড়া কী ভীষণ খিদে পেয়েছে। আহা কেউ যদি এক্ষুনি গরম সোনামুগের ডাল, বাঁশকাঠি চালের ভাত, পাঁচমিশেলী তরকারি, আর তেলাপিয়া মাছের ঝাল মুখের সামনে ধরত।
সত্যরঞ্জন হঠাৎ ইউরেকা বলে চেঁচিয়ে উঠলেন। যা ভাবছেন তাই বোধহয় ঠিক। ব্যাপারখানা দিনের আলোর মত পরিস্কার। এমন যে কিছু একটা হতে পারে তা আগেই আঁচ করা উচিত ছিল। মৃদু গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন, ম্যাপখানায় যাবার আর ফেরবার রাস্তা একনয় কেন বুঝতে পারছিস?
এইবার গবু বুঝতে পারছে। যে পথে আসা যায় সে পথেই ফেরা যায় না কেন? এমনভাবেই হয়ত সব ক্রমাগত ওলটপালট হতে থাকে। পথ ক্রমাগত মুছে যায়। রাস্তাই মুছে গেলে আর সেই রাস্তায় ফেরা যাবে কিভাবে?
দুজনে চুপ করে বসে রইলেন। নেহাত ঝোঁকের বশে বেরিয়ে পড়া বোধহয় উচিত হয়নি। এ জঙ্গল এত ভয়ানক হবে তা কে জানত।
     আচমকা ঘন্টার আওয়াজে দুজনের সম্বিত ফিরল। সত্যরঞ্জন গা ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ঘাবড়াও মৎ! ম্যাপে ফেরবার হদিস তো দেওয়াই আছে। চল ব্যাপারখানার শেষটুকু দেখেই আসা যাক। ওঠ ওঠ, দেরি করিস না। বেলাবেলি ফিরতে হবে।
গবু উঠে বসল। শিংশপা গাছটা থেকে বাঁদরগুলো কখন পালিয়েছে। বনের ভেতর থেকে একঝাঁক টিয়াপাখি উড়ে গেল। সেদিকে চেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে সত্যরঞ্জনের পেছুপেছু বনের ভেতর ঢুকে পড়ল।

No comments:

Post a Comment