দুপুর তিনটের সময় খাঁ
খাঁ রোদে এয়ারফিল্ডে দাঁড়িয়ে আমি কি করছিলাম। আমার হাতে ধরা ছিল তিরিশ
সেন্টিমিটার উইংস্প্যানের এয়ারক্রাফট। প্রপেলার ঘুরতে শুরু করা মাত্রই সামান্য
দৌড়ে হাল্কা জোরে ছুঁড়ে দিয়েছিলাম পশ্চিম উত্তর-পশ্চিম দিক বরাবর। নিখুঁত থ্রো।
পাইলটের কোন অসুবিধা হয়নি। বাতাসে সাঁতার কেটে সাদা সীগ্যালের মত প্লেনটা উঁচুতে
উঠে গিয়েছিল।
মুহূর্তে দৌড়ে ফিরেছি
গ্রাউন্ড স্টেশনে। ল্যাপটপ স্ক্রীনে একের পর এক সংখ্যা। জিপিএস ট্র্যাকিং এরর
সিক্স মিটার। স্টেবল ফ্লাইট। নাথিং টু ওয়ারি। অটোপাইলট ইজ রেকর্ডিং ভেহিকল-ডেটা।
ভেহিকল ইজ হেডিং টুওয়ার্ডস ইটস ফার্স্ট ওয়েপয়েন্ট। হোয়াট ইউ ওয়ান্ট টু ডু
তিতাস?
আপাতত আমার কিছু করার
নেই। অবজার্ভেশন করা ছাড়া। থ্রি মিনিটস এন্ড কাউন্টিং।
এখানে আকাশ বড়ো নীল।
হাল্কা সাদা তুলোর মত ইতঃস্তত মেঘ। প্রখর আলোয় বেশীক্ষণ তাকানো যায় না। উপরে মুখ
তুলে চেয়ে দেখলুম মৃদু আওয়াজ করে ভেসে আসছে এএক্সাই ইঞ্জিনের শব্দ। সীগ্যাল ইজ
ফ্লাইং।
চিরঞ্জিতের দৃষ্টি
স্ক্রীনের উপর স্থির। ও জানে ওকে কি নির্দেশ দেওয়া আছে। আরো দুমিনিট পর ও লঞ্চ
করবে এম এফ সি আপ্লিকেশনটা যার বিশেষ উদ্দেশ্য সাধিত হওয়া নিয়ে আমাদের কোনো
সন্দেহ নেই।
ঠিক সেই মুহূর্তে আকাশে
একটা চিল দেখা গেল। ছোঁ মেরে নীচের দিকে নেমে আসছে। ডানদিক থেকে আর একটা। না, আরো দুটো। সবকটার লক্ষ্যই হলো ওই সাদা সীগ্যাল, আপাতত প্রায় পঁয়ত্রিশ ডিগ্রী ব্যাঙ্ক নিয়ে
যে রানওয়ে বরাবর উড়ে চলেছে।
টেল লক্ষ্য করে প্রথম
ছোঁ। চিলটার ভেক্টরের কনসেপ্টটা নেই। মিস করেছে। কিন্তু অন্য দুটো সমানে তাড়া করে
চলেছে এখনো। আড়চোখে দেখলাম হরিকুমারের হাতে ক্যামেরা। ট্রাইপড মাটিতে।
সীগ্যাল এখন তৃতীয়
ওয়েপয়েন্টের দিকে। মাটি থেকে একশ পঞ্চাশ মিটার উঁচুতে। মৃদু বাতাসের ঝাপটা সামলে
সঠিক কোর্সে। তিনটে চিল এবার প্রায় একসাথে ধেয়ে এলো। চিরঞ্জিত কি লঞ্চ করেছে
আপ্লিকেশনটা?
হঠাৎ উড়োজাহাজ তার গতি
বাড়ালো। দূরত্ব বাড়ছে। প্রথমে ডানদিক এবং তারপর বাঁদিকে রোল, তারপর সটান ইউ টার্ণ। চিলগুলো কিছুতেই ভেবে
পাচ্ছে না হঠাৎ কি হলো। তাড়া করা ছেড়ে দিয়েছে। সীগ্যাল এখন ওদের থেকে অনেক
দূরে। সটান ফিরে আসছে রানওয়ের দিকে।
—কিছু একটা করতেই হত তাই না? যেভাবে ছুটে আসছিল!
আমাদের পাইলট হাসছে, ওর হাতে ট্রান্সমিটারের জয়স্টিক এখনো ধরা।
হরিকুমার বিড়বিড় করে উঠল। পালটা মৃদু হেসে গ্রাউন্ড স্টেশনের দিকে এগিয়ে গেলাম।
রোদে তেতে পুড়ে প্রিয় সীগ্যাল এখন ধীরে ধীরে নেমে আসছে মাটিতে। দশ সেকেন্ডের
গ্লাইডের পরেই যার রানওয়ের মসৃণ ছোঁওয়ার কথা।
চিরঞ্জিত একটু অবাক চোখে
কম্পিউটরের উপর ঝুঁকে।
—প্রোগ্যামটা পেন ড্রাইভ থেকে কপি করোনি তিতাসদা?
—প্রোগ্রাম...হ্যাঁ...সে কি! যাঃ শালা...
হরিকুমার সশব্দে হাততালি
দিচ্ছে। সীগ্যাল এখন মাটিতে স্থির। পাইলট সপ্রশংস চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা জনতা এসে আমাদের হাত ধরে ঝাঁকিয়ে যাচ্ছে। আমার শুধু
এটুকুই মনে পড়ছিল যে একটি বড় মূর্খামি করে ফেলেছি।
এবং এভাবেই ভারতের প্রথম
তিরিশ সেন্টিমিটারের মাইক্রোএয়ার ভেহিকলের ছেচল্লিশতম ফ্লাইট ট্রায়াল সম্পন্ন
হল। লগবুক মোতাবেক। সিগনেচার, ডেট।