Monday, 9 April 2012

রোজনামচা ৮


ঐ যে, মেয়েটা, লালরঙা শাড়ী পরে প্রিজন ভ্যানে উঠছে
সবুজ ব্লাউজ, কাঁধে রাজ্যের অনিশ্চয়তা আর
ছোট একটা লিকলিকে কিছু মতো

ঐ তো, ও লাঠির মার খেল। একচুলের জন্য বেঁচে গেল
ক্ষুদ্র মাথা, তাপ্পি ছবি সাঁটা সবুজ পলিথিন জগত
ও কালো প্রিজন ভ্যান।

ঐ তো পড়ে গেল সে, কেউ ছবি তুলছে। ছবি থেকে ছবি
বাদ গেল। শিশু শব্দটাও বেশ অশ্লীল কিনা।

ঐ তো এবার আরেকজন। কালো নোনাডাঙা হাত ধরে
আছাড়ি পিছাড়ি লাঠির রক্ত
ভীড়ের মধ্যে একসাথে ওও পড়ে গেল।
আঁতিপাঁতি করে খুঁজছে হাত বা পা বা চীৎকার।

ঐ ফের ভেসে উঠল মাথা, একহাতে প্রিজন ভ্যানের হাতল, অন্য
হাতে আলটপকা বাতাস। মাথায় প্রখর রৌদ্র নিয়ে দেখলুম,
এই প্রথমবার

ধূসর মাটিতে পড়ে আমার ঘোতনের আটমাস।

Friday, 6 April 2012

রোজনামচা ৭


—‘বোড়ের পাশের গজের কথা ভাবছ না যে বড়। ও শ্যামরতন, শেষে বয়সকাল বুঝি ছাপ ফেলল!
—‘উঁহু, ও তোমার চাল জানি, বুদ্ধি পাকছে হে। বয়স হচ্ছে, বুদ্ধি পাকছে। গজের প্রতি মায়া নেই। মন্ত্রীই আসল। কাল পালায় দেখলে না!
—‘...’
—‘তবে এবার ততটা জমে নি। বায়না কম পড়েছিল। শেষে ঝাড়গ্রামের কেষ্টবিষ্টুরা সব...এই আমাদের নলিন, এরাই তো শেষে হাল ধরেচে। নইলে... জ্যারকেন টা একটু উস্কে দাও দেখি।
—‘তোমার নাতি ফিরচে কবে?’
—‘কারিগর ছাড়তে চাইলে তবে তো। হাতের কাজ ভাল। ছাড়বে কেন। এই তো নিয়ম। সামলাও সামলাও নৌকো সামলাও
—‘...’
—‘...’
—‘শ্যামরতন
—‘উঁ
—‘কাল চরের মাঠের ঘটনা কি সত্যি।
—‘তাই মনে হয়। সনাতনের জ্বর আজকেও তো নামেনি।
—‘সত্যি দেকচে তাহলে?’
—‘আরে, ও তো আমিও দেকিচি কতবার। সদার বাপ সেজে ডাকতে আসত, মনে নেই? জংলার চরে, মোহানার কাছটা, এত এত মাছে পড়েছে জালে, বুঝলে। এদিকে আমার খিড়কির কাছে এসে বলছে, খোল আমি সদার বাপ। আর ওদিকে গিয়ে বলছে, শ্যামরতন এলুম গো, দোর খোল বৌঠান। সিকির দাদুও দেখছেখন। সনাতনের অল্প বয়স কিনা, তাই ভয় পেয়েছে। সবসময় লোহার শেকল রাখতে হয়।
—‘...’
—‘...’
—‘শীত বাড়ল যে শ্যামরতন। যাবার সময় জ্যারকেন নিয়ে যেও খন। দাদুভাইকেও সঙ্গে নিয়ে যেও। এবার জমি কেমন, চাষ কেমন বুঝছ—’

ক্রমশঃ ধূ ধূ রাত বাড়ে। ইঁটভাটি, ঝিঁঝিঁ পোকা, আশশ্যাওড়া বেয়ে চলাফেরা বাড়ে। রুপোলী আঁশ মাখা জাল ছুড়ে দেয় কেউ চরজংলায়। তালপাতা বোনা ঘর উঠোন দোর আদুল গায়ে মাখে রাত। হাজার হাজার অশরীরী ভিড় করে আসে জলাভূমি, ডুলুং নদী, তপোবন, নিশিকান্তর পালা পেরিয়ে ভূতপতরীর মাঠে। তাদের ভীড়ে মিশে আমিও ফিরে পড়ি সেইসব ধ্বসে পড়া ভিটেমাটিচুড়োয়, যেখানে এখনো প্রতিদিন আবছায়া পূর্ব্বপুরুষ অক্লান্ত ভাবে এগিয়ে দেয় ঘোড়ার আড়াইহাত। নিবুনিবু হ্যারিকেন সমেত।

রোজনামচা ৬


সারাদিন চুপ করে শুয়ে রইলাম। লিভার ট্রাবল। নানারকম রোল, বিরিয়ানী, রোস্ট, কাবাব ইত্যাদির ফলশ্রুতি। গভীর অনুশোচনায় ভুগে দুপুরের ঝোলভাত অবশ্য সোনামুখ করে খেতে হয়েছে। এরকম রোজ চলবে এখন। তা চলুক গে। সব ভালো জিনিসই একসময় শেষ হয়।
—‘বারবার বলেছিলুম পলাটা পরতে, শুনলি না আমার কথা। পলা শরীর ভালো রাখে। শুনবি না তুই
—‘...’
—‘পলাটা পরে নে না। কতবার বলছি তোকে।
—‘...’

শুয়ে শুয়ে আবিষ্কার করলুম কত পুরোনো চিন্তা এখনও শেষ করা হয়নি।

মেয়েকে একটা মোটরাইজড টেলিস্কোপ কিনে দেবো। ডিসপ্লে প্যানেল থাকবে। আজিমুথ এলিভেশন কন্ট্রোল সিস্টেম সমেত। সাথে পেপার চার্ট। রাতের আকাশের নীহারিকা ধরা পড়বে মায়াবী আলোয়। এম ৮১? না না এম ৮৬ বোধহয়। সুপারনোভা ইত্যাদি সেইসব আদ্যিকালের গপ্পো...
রোল কাবাব বিরিয়ানী ইত্যাদিদের ধন্যবাদ, শেকলে বাঁধা না পড়লে আরবিট চিন্তা করার স্কোপটাই মিলত না। নো ফ্রী লাঞ্চ থিয়োরেম। সবসময় ফিট থাকাটা বড় অন্যায়। নয় কি?

—‘চান করে উঠে পলাটা পড়ে নিস। আমি কি তোর ভাগ্য ফেরানোর জন্য বলছি? ওতে শরীর ঠিক থাকে। মায়ের এই কথাটা তো শোন। আর কোন দিন কিছু বলব না তোকে।

শুয়ে শুয়ে ঠিক করলুম মেয়েকে সহজপাঠের ছবিগুলো অন্যভাবে এঁকে দেবো। নিছক সাদাকালো ভিত্তিক নয়। নন্দলাল রোল খাননি বোধহয় কোনোদিন।
সুতরাং অল শ্যুড বি ইন গ্রে শেডস।
আঁকতেই হবে।

পলাটা পরে ফেলার আগেই।

Tuesday, 3 April 2012

রোজনামচা ৫


দুপুর তিনটের সময় খাঁ খাঁ রোদে এয়ারফিল্ডে দাঁড়িয়ে আমি কি করছিলাম। আমার হাতে ধরা ছিল তিরিশ সেন্টিমিটার উইংস্প্যানের এয়ারক্রাফট। প্রপেলার ঘুরতে শুরু করা মাত্রই সামান্য দৌড়ে হাল্কা জোরে ছুঁড়ে দিয়েছিলাম পশ্চিম উত্তর-পশ্চিম দিক বরাবর। নিখুঁত থ্রো। পাইলটের কোন অসুবিধা হয়নি। বাতাসে সাঁতার কেটে সাদা সীগ্যালের মত প্লেনটা উঁচুতে উঠে গিয়েছিল।

মুহূর্তে দৌড়ে ফিরেছি গ্রাউন্ড স্টেশনে। ল্যাপটপ স্ক্রীনে একের পর এক সংখ্যা। জিপিএস ট্র্যাকিং এরর সিক্স মিটার। স্টেবল ফ্লাইট। নাথিং টু ওয়ারি। অটোপাইলট ইজ রেকর্ডিং ভেহিকল-ডেটা। ভেহিকল ইজ হেডিং টুওয়ার্ডস ইটস ফার্স্ট ওয়েপয়েন্ট। হোয়াট ইউ ওয়ান্ট টু ডু তিতাস?

আপাতত আমার কিছু করার নেই। অবজার্ভেশন করা ছাড়া। থ্রি মিনিটস এন্ড কাউন্টিং।

এখানে আকাশ বড়ো নীল। হাল্কা সাদা তুলোর মত ইতঃস্তত মেঘ। প্রখর আলোয় বেশীক্ষণ তাকানো যায় না। উপরে মুখ তুলে চেয়ে দেখলুম মৃদু আওয়াজ করে ভেসে আসছে এএক্সাই ইঞ্জিনের শব্দ। সীগ্যাল ইজ ফ্লাইং।

চিরঞ্জিতের দৃষ্টি স্ক্রীনের উপর স্থির। ও জানে ওকে কি নির্দেশ দেওয়া আছে। আরো দুমিনিট পর ও লঞ্চ করবে এম এফ সি আপ্লিকেশনটা যার বিশেষ উদ্দেশ্য সাধিত হওয়া নিয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই।

ঠিক সেই মুহূর্তে আকাশে একটা চিল দেখা গেল। ছোঁ মেরে নীচের দিকে নেমে আসছে। ডানদিক থেকে আর একটা। না, আরো দুটো। সবকটার লক্ষ্যই হলো ওই সাদা সীগ্যাল, আপাতত প্রায় পঁয়ত্রিশ ডিগ্রী ব্যাঙ্ক নিয়ে যে রানওয়ে বরাবর উড়ে চলেছে।

টেল লক্ষ্য করে প্রথম ছোঁ। চিলটার ভেক্টরের কনসেপ্টটা নেই। মিস করেছে। কিন্তু অন্য দুটো সমানে তাড়া করে চলেছে এখনো। আড়চোখে দেখলাম হরিকুমারের হাতে ক্যামেরা। ট্রাইপড মাটিতে।

সীগ্যাল এখন তৃতীয় ওয়েপয়েন্টের দিকে। মাটি থেকে একশ পঞ্চাশ মিটার উঁচুতে। মৃদু বাতাসের ঝাপটা সামলে সঠিক কোর্সে। তিনটে চিল এবার প্রায় একসাথে ধেয়ে এলো। চিরঞ্জিত কি লঞ্চ করেছে আপ্লিকেশনটা?

হঠাৎ উড়োজাহাজ তার গতি বাড়ালো। দূরত্ব বাড়ছে। প্রথমে ডানদিক এবং তারপর বাঁদিকে রোল, তারপর সটান ইউ টার্ণ। চিলগুলো কিছুতেই ভেবে পাচ্ছে না হঠাৎ কি হলো। তাড়া করা ছেড়ে দিয়েছে। সীগ্যাল এখন ওদের থেকে অনেক দূরে। সটান ফিরে আসছে রানওয়ের দিকে।

কিছু একটা করতেই হত তাই না? যেভাবে ছুটে আসছিল!
আমাদের পাইলট হাসছে, ওর হাতে ট্রান্সমিটারের জয়স্টিক এখনো ধরা। হরিকুমার বিড়বিড় করে উঠল। পালটা মৃদু হেসে গ্রাউন্ড স্টেশনের দিকে এগিয়ে গেলাম। রোদে তেতে পুড়ে প্রিয় সীগ্যাল এখন ধীরে ধীরে নেমে আসছে মাটিতে। দশ সেকেন্ডের গ্লাইডের পরেই যার রানওয়ের মসৃণ ছোঁওয়ার কথা।

চিরঞ্জিত একটু অবাক চোখে কম্পিউটরের উপর ঝুঁকে।
প্রোগ্যামটা পেন ড্রাইভ থেকে কপি করোনি তিতাসদা?
প্রোগ্রাম...হ্যাঁ...সে কি! যাঃ শালা...

হরিকুমার সশব্দে হাততালি দিচ্ছে। সীগ্যাল এখন মাটিতে স্থির। পাইলট সপ্রশংস চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা জনতা এসে আমাদের হাত ধরে ঝাঁকিয়ে যাচ্ছে। আমার শুধু এটুকুই মনে পড়ছিল যে একটি বড় মূর্খামি করে ফেলেছি।

এবং এভাবেই ভারতের প্রথম তিরিশ সেন্টিমিটারের মাইক্রোএয়ার ভেহিকলের ছেচল্লিশতম ফ্লাইট ট্রায়াল সম্পন্ন হল। লগবুক মোতাবেক। সিগনেচার, ডেট।

রোজনামচা ৪


কয়েকটা ডট্‌। মাঝখানে শূন্যস্থান। পাতার পর পাতা নিঃশ্বাস উঠছে পড়ছে অথচ ডট্‌গুলো ভীষণ রকম ইনভেরিয়েন্ট। আই নিড সামথিং এলস।

সলিউশন শব্দবন্ধটা আসলে আপেক্ষিক। এবং এটা জানা সত্ত্বেও কিছুতেই দাঁত ফোটানো যাচ্ছে না অঙ্কটায়।



অঙ্কবলা উচিত কি হবে? ইয়েস, আলজেব্রেইক ফ্রেমওয়ার্কে এই চার লাইনের প্রবলেম যা ইঙ্গিত বহন করছে তাতে মনে হয় এটা অঙ্ক। কিন্তু এটা যদি অঙ্ক হয় তবে এর কোন কনসিসটেন্ট সমাধান থাকা উচিত। সমাধান যদি থেকেই থাকে তাহলে একাধারে পি ইকোয়ালস টু এন পি ও সম্ভব। আর তাই যদি হয় তাহলে তাবৎ আক্সিওম গুলোরই ধ্বসে পড়ার কথা। হোমস, আই স্মেল সামথিং এলস।

হোয়াট ইজ ইট, ওয়াটসন?
র‍্যশনালিটি হোমস, র‍্যাশনালিটি। ওরা বড় বেশি যুক্তিনির্ভর। যুক্তিই ওদেরকে আটকে রেখেছে হোমস। উই নিড সামথিং এলস। আ রাদার এলিমেন্টারী ওয়ান।
ওয়েল, হোয়্যার ইজ ইট ওয়াটসন?

ইটস রাইট ইন হিয়ার হোমস। রাইট ইন হিয়ার। কপালের ঠিক মাঝখানে। পিন পয়েন্টেড। কোন শার্প লম্বা গজাল দরকার। হাতুড়ীর একটা মাত্র ইমপালস। দুসেকেন্ড। তারপরেই ওরা আলাদা হয়ে যাবে। আলাদা জগত হোমস। নো র‍্যাশনালিটি। চুপচাপ নিস্তেজ হয়ে শুধুমাত্র অবসার্ভেশন।
আন এক্সেলেন্ট আইডিয়া ওয়াটসন, বাট, হোয়াট উইল হ্যাপেন টু দ্য প্রবলেম?
কেডি ট্রী হোমস, কেডি ট্রী। হাফ স্পেস পার্টিশনিং। অঙ্কটাও ভাঙতে শুরু করবে নিজেকে। মোক্ষম জায়গায় জায়গায় হাতুড়ী মেরে। বিভিন্ন ডাইমেনশনে ছড়িয়ে যেতে শুরু করার আগে চলো আমরাই ওর শূন্যস্থানগুলোয় ঢুকে পড়ি।


**Nobel Prize for Physiology or Medicine of 1949 was awarded to António Egas Moniz

রোজনামচা ৩


ডেমিয়া, ভাইসর, গ্রান্ট্‌, স্ট্রাইপ...।
ইউ হ্যাভ লস্ট দ্য লিড।

আহ্‌ রেলগানটা কোথায়? এফোঁড় ওফোঁড় করে দেবো শালা গ্রান্টের বাচ্চা। কোথায় পালাবি? মেশিনগান আমি পছন্দ করি না। প্লাসমা মাচ বেটার। চালাকি পেয়েছিস শালা, ওষুদের দোকান বন্ধ তো আমি কি করব? রাত আটটার পর...বলেছিলাম না...এই যে আরেক গান্ডু...হ্যাঁ ওই ওপর দিকে তাকিয়েই গুলি ছোঁড় হতভাগা...ওই হবে তোর...ভুলে গেছিলাম বাজারের ব্যাগ নিতে, তো কী হয়েছে! আহ্‌, দুমিলিমিটারের জন্য মিস...এবারেও হল না সেন্ট পার্সেন্ট আকুরেসি।

ডেমিয়া, ভাইসর, গ্রান্ট্‌, স্ট্রাইপ...।
ইউ হ্যাভ লস্ট দ্য লিড।

কি হচ্ছে! ডেমিয়ার সরে যাবার কথা ছিল, বাঁদিকে। প্রোগ্রামে কি স্টোকাস্টিক কিছু রেখে দিয়েছে নাকি? আবে ফোটো তো...বিয়ে হয়েছে তো কি? আমি কি স্ত্রৈণ নাকি? আহ্‌, তৎসমের বাচ্চা...এই নে...রেলগান দিয়ে মুন্ডু ওড়াব তোর আজকে। আহ্‌,

ডেমিয়া, ভাইসর, গ্রান্ট্‌, স্ট্রাইপ...।
ইউ হ্যাভ লস্ট দ্য লিড।

ফোকাস, উজবুক ফোকাস! সামনে এসে প্রথমেই দেখছিস না বাঁদিকে বাঁকছে...ঠিক ঐ সময়...যত রাজ্যের আপদ মাইরি...খাওয়ার পর ন্যাতা দিয়ে মুছে দিয়েছিলাম তো জায়গাটা...একটা ভাতের টুকরো...আবে ধুত...এই নে...এই নে...ডেডবডি! ফ্র্যাগড!...রক্তমাংস পড়ে রয়েছে তোর, ভাইসর...এই ভাইসর, আয়...দেখ তোর পলিগন এঁটোকাঁটা গুলো কেমন মুছে দিচ্ছি...এই নে শালা...নে নে...আহ্‌

ডেমিয়া, ভাইসর, গ্রান্ট্‌, স্ট্রাইপ...।
ইউ হ্যাভ লস্ট দ্য লিড...

রোজনামচা ২


তো, আরো একটা বিকেল শেষ হলো। কিছু নির্লিপ্ত ছেলেমেয়ে ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল ক্লাসরুম ছেড়ে। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বোর্ডে একপ্রস্থ জমি তৈরী করলাম। আধখ্যাঁচড়া ইকোয়েশন মুছে গিয়ে শূন্য চৌকো বক্স। ভেরিয়েবল্‌স গুলোর আদ্দেকটা উড়ে গেছে। সন্ত্রস্ত। জমির উপর হালকা চকের আস্তরণ।

প্রথমে একটা বাড়ী তৈরী হল। কোন রকম স্থাপত্য নকশা না মেনে অবশ্যই। পাশে সারিসারি বেড়া। যথাক্রমে তার পাশে গাছ। সামনে ঢেউ খেলানো নদীবিশেষ। এবং নৌকো। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। আকাশে দুটো অসমঞ্জস পাখি। কিন্তু কী যেন নেই? ও হ্যাঁ মনে পড়েছে, একটা বাঁকা হাতে লেখা ভেরিগুড’, সিগনেচার, ডেট।

সটান সবকিছু মুছে দিয়ে আড়চোখে দেখলুম জানালার ওপাশে ওরা দাঁড়িয়ে। চাবির রিং দুলছে। মৃদু গুঞ্জন। মানিব্যাগের ভেতর আইডেন্টিটি কার্ড। মোটা মানুষ, রোগা মানুষ, সরু মানুষ, লম্বা মানুষ, কত মানুষ...।

—‘চা খেতে যাবে না তিতাসদা?’

হ্যাঁ, তাই তো। আমি তো চা খেতে যেতেই পারি। কেন নয়? কি হবে আর ভেবে। যা গেছে তা গেছে।

লঘুপায়ে শ্লথ গতির পাজোড়া টেনে টেনে নামতে থাকি মাটিতে। কাঁচঘেরা গোল্ডেন কোয়াড্রাঙ্গেলের পাশ দিয়ে, সিঁড়ি বেয়ে একপা দুপা। ক্রমশঃ বহু পা। ছন্দ মিলিয়ে হাঁটি। চোখের ভেতরে নিভৃত চোখে দেখি আরো কত চঞ্চল চোখ, কত চঞ্চল স্বর। ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট স্ন্যাপশটস...
একটাআআআ বাজিল, এখনো কুমির এল না।
দুউউউটোওওও বাজিল, এখনো কুমির এল না।
তিনটেএএএ বাজিল, এখনো কুমির...

রোজনামচা ১


রাতবিরেতে একা একা ঘুরে বেড়াই। স্কুটার। তেল পোড়ে। মধুকা মার্গ। কানের পাশে ক্রমাগতঃ শব্দ। স্পিডোমিটার অনুযায়ী তিরিশ সেন্টিমিটারের আনম্যান্ড এরিয়াল ভেহিকলটার ক্রুজ স্পীডও এটাই। আমার হাতের কব্জির শীতবোধ ক্রমশঃ উঠে আসে গলায়। নির্লিপ্তি নিয়ে এগিয়ে পিছিয়ে দেখি একমাত্র উষ্ণতা জমানো স্থানগুলোতেও ইন্টিগ্রাল জিওমেট্রিরা দিব্যি বসে আছে।

রাস্তার দুধারে গাছ। নাম গোত্রহীন। অবশ্য কেই বা কবে ভেবেছে ওদের পরিচয়, স্টুপিড ইকোলজির মেয়েগুলো ছাড়া। আমি অতশত চিনি-টিনি না, বড়জোর ওই লালরঙা গাছটাকে শাপমন্যি করতে পারি, কারণ শালারা বাম্পার বসানোর আর জায়গা পায় নি।

মাঝে মাঝে,ঘড়িতে দুটো বাজলেই আমার পাশের ল্যাবে যেতে ইচ্ছে করে। গ্রীসের অর্থনীতি নিয়ে এমন ফোকটে জ্ঞানার্জনের সুযোগ কে ছাড়ে। কেই বা বুঝবে এই যত রাজ্যের ইন্ট্রাক্টেবল প্রবলেম নিয়ে চুপ করে শুয়ে থাকা, বড় বোরিং। তার থেকে বেগম আখতারের গলা নকল করা মাচ বেটার।
কিন্তু এটা কী ইয়ার্কি? পাতার পর পাতা, যেখানে, অক্ষরের চেয়ে প্রতীকের ছড়াছড়ি বেশী, সেই দুনিয়াতে অপচয়? ক্ষমাহীন। মাঝে মাঝে চুপ করে থাকি। ব্রেইল লিপির মতো, মনে মনে ভাবি, সিম্বলগুলোকে কেউ কোন অবয়ব দিলো না হে। সেই বইটার কি যেন নাম ছিল, ফ্ল্যাট স্পেস?

বিশ বছর আগে, বুকশেলফ থেকে খুঁজে পেয়েছিলুম, বাবার কবিতার খাতা। কালো কালির পেনে, রুলটানা খাতায় লেখা ছিল, ‘একদিন আমি রাজা হবো।নীচে অনেকটা স্পেস। হেসেছিলুম, জানেন। মাকালীর দিব্যি।

আজ দেখি লেখাগুলো ঘুরে ফিরে আমার খাতার ভিতর। একদিন আমিও রাজা হবো’... শুধু নীচে এখন আর কোনো স্পেস নেই।