Sunday, 31 July 2011

হরিশরাজার জঙ্গলে- পর্ব ৮

সকাল হতে না হতেই সৌদামিনী দেবী চীৎকার করতে শুরু করলেন, ‘আমি কিছু বুঝি না, না! অ্যাঁ, কোথায় যাওয়া হয় রাতবিরেতে। মাগো মা, পেটে পেটে এত। বিয়ের সময় ওরা বলল, ঠাকুরঝি তোমার কত ভাগ্য, আমাদের বড়দা একেবারে সুপুত্তুর। কী পোড়াকপাল আমার। ছি ছি, রাতের বেলা কোনো ভদ্দরলোকে চোর সেজে বেরোয়? আবার লন্ঠনটাকেও কোন চুলোর দোরে ফেলে এসেছে। আমি এসব সইব না এই বলে দিলুম। রাতের বেলা বুদ্যোদেবের মতো চুপিসাড়ে গৃহত্যাগ করবে আবার রাত না ফুরোতেই কোথা থেকে হুড়মুড়িয়ে ডাকাতের মতো ঘরে সেঁধোবে, এসব হচ্ছে কী শুনি। ও মা গো, ভেবে ভয়েই তো আমার পেট গুড়গুড় অ্যাই ভালো চাও তো ঝেড়ে কাশো, নইলে এই আমি হাটের মাঝে হাঁড়ি ভাঙলুম।’
সত্যরঞ্জন প্রবল মুখঝামটার মুখেও বালিশ আঁকড়ে ধরে বিছানায় পড়ে রইলেন। গত রাতে যা ঘটেছে তার তুলনায় এসব তো শিশু। লন্ঠনটা ফেলে এসেছেন। উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়তে গিয়ে দুপাটি চটি কোথায় গায়েব হয়েছে। থলথলে শরীরে আমন আচমকা দৌড়ঝাঁপ পোষায় নাকি। বাড়ি আসা ইস্তক বার বার কেঁপে কেঁপে উঠছেন। ঐ ভৌতিক দৃশ্য মনে পড়লেই প্রায় মুচ্ছো যাবার মতো অবস্থা। প্রাণে বেঁচেছেন এই ঢের। ভাগ্যিস গবু ছিল নাহলে ওইখানেই দেহত্যাগ করতে হত আর কী।
এদিকে সৌদামিনী বলে চলেছেন, ‘আমি আজই পিসেমশাই কে খবর পাঠাচ্ছি। পিসেমশাই আসুক, আমি বলবখন গতবছর কে ঘোষেদের গোয়ালে ছাতা নিয়ে ঢুকেছিল। আমি নিজেই জজকোটে সাক্ষী দেব। আমি সব্বাইকে বলব যে গেলবার ধান তোলার সময় বিন্তীপিসীর হাতবাক্স কেন ভাঙ্গা ছিল। পিসেমশাই এর সাধের আলোয়ান কেন হাট থেকে চুরি যায় আর সেটা কে গায়ে দিয়ে শোয়—’
সত্যরঞ্জন উশখুশ করতে লাগলেনএইজন্যেই মেয়েদের বিশ্বাস করতে নেই। ওদের পেটে একটুও কথা থাকে না। অমন সাংঘাতিক গায়ে কাঁটা দেওয়া ঘটনার পর কোথায় যে একটু ধাতস্থ হবেন তার যো নেই।
—‘আর পাশের ঘরের ঐ হতভাগা পড়াশোনায় গোমুখ্যু, এদিকে খাওয়া দাওয়ার শেষ নেই। বলদও নয় যে হাটে বেচব। সারাদিন দুজনে মিলে খালি গুজগুজ আর ফুসফুস। আমি এই বলে দিলুম—’
সত্যরঞ্জন বিরক্ত হয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন। চুড়ান্ত অপমানিত। শেষে কিনা পিসেমশাইয়ের ভয় দেখাচ্ছে। ওরকম জাঁদরেল উকিল সত্যরঞ্জন ঢের দেখেছেন। ভারী তো। গত রাতের অমন অশৈলী কান্ডের সামনে পড়লে নির্ঘাত দাঁত ছরকুটে পড়ে থাকত। সত্যরঞ্জন তো তার উপর অলিম্পিক রানার কে হারিয়ে দেবার মতো দৌড়েছেন। কী সাংঘাতিক দৌড় রে বাবা। এমনই বহর যে বাড়ী চলে আসার পরও হাত পা থামতে চাইছিল না। নেহাত গোয়েন্দাসুলভ মন্ত্রগুপ্তি আছে তাই, নইলে এক্ষুনি সমস্ত কিছু ফাঁস করে দিলেই হয়। কোথায় একটু সেবা যত্ন আহা উহু করবে তা নয় কেবল পিসেমশায়ের হুড়ো দিচ্ছে। দুত্তোর!
     সত্যরঞ্জন কাপড় জামা গায়ে চড়িয়ে পাম্পশু পরে পাশের ঘরে গিয়ে ঠক ঠক করে তিনবার কড়া নাড়লেন। গবু জেগেই ছিল। দরজা খুলে বেরিয়ে এল।
শোন, এ সংসার আর আমার জন্যে নয়। আমি গৃহত্যাগ করছি।
এরকম প্রায়শই হয়। নতুন কিছু নয়। মাঝে মধ্যেই সত্যরঞ্জন প্রতিজ্ঞা করে গৃহত্যাগ করেন। পরের ঘটনাসমূহও বেশ নিয়মমাফিক। প্রথমে কালীগঞ্জের হাট অবধি পদব্রজে বীরদর্পে আগমন ও শিবু ময়রার দোকানে জলযোগ সহকারে সাময়িক বিরতি। অনুপান হিসেবে চা। পথিমধ্যে নানান অপোগন্ডের দিকে ক্রুর দৃষ্টি নিক্ষেপ। এরপর ধীরেসুস্থে রেলস্টেশন অভিমুখে উদাস মনে যাত্রা। যাত্রা অন্তে গলদ্ঘর্ম হয়ে স্টেশনে আগমন ও বেঞ্চে বসে তাঁর অবর্তমানে সৌদামিনীর কষ্ট বোধ করে পুলকিত হওন। পকেট গড়ের মাঠ হওয়া ইস্তক বাদাম ভাজা ভক্ষন ও নিজের অবস্থা সমন্ধে চিন্তা। শেষমেষ সন্ধ্যার মেলট্রেন আসা মাত্র ক্ষুধায় ব্যাকুল হয়ে কাঁচুমাঁচু মুখে গৃহে প্রত্যাগমন। প্রতিবারই পুরো পরিক্রমায় গবু সাথে সাথে থাকে। তাই এবারও দ্বিরুক্তি না সে অনুগত ভক্তের মতো জামাজুতো পড়ে সত্যরঞ্জনের সঙ্গ নিল।
     মৃদু হিমেল হাওয়া বইছে। নরম রোদ। বাইরে হাল্কা কুয়াশা। চবুতরা পেরনোর সময় গবু দেখল বনমালী বাবুর ছাগলটা সৌদামিনীর শখের কৃষ্ণকলি গাছের পাতা চিবুচ্ছে। রাস্তা দিয়ে খেতমজুরদের দল হাল বলদ নিয়ে চাষ করতে চলল। আশেপাশের গাছপালা থেকে টুপটাপ শুকনো পাতা উড়ে আসছে। শীত এল বলে।
     গতরাতে তার ভালো করে ঘুম হয়নি। হবেই বা কী করে। এমনভাবে ভূত দেখতে হবে কে জানত। আর কী সব অনাসৃষ্টি কান্ড বাবা। দিনের বেলাতে সব কেমন দিব্যি দেহ ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দেখে একটুও বোঝার উপায় নেই। রাতে আবার তেড়ে মেরে দাঁত খিচুচ্ছে। এরকম আরো কত আছে কে জানে। তবে ছোটবেলা থেকে যত ভুতের গল্প পড়া তার সাথে এটা একটুও মিলছে না। দুনিয়ার তামাম অপদেবতাদের তো কুলোর মত কান আর মুলোর মত দাঁত। কারোর তো সবুজ রঙ্গের মাথা আছে বলে শোনেনি। তবে কলিকালে কত কিছুই না হয়। এখনতো মনে হচ্ছে পাশের গ্রামের মোড়লমশাইয়ের ছোটছেলেটাও বোধহয় ভূত। ওর কান দুটো যেন কেমন খাড়া খাড়া। তারপর জলবেহারী, মন্মথ, পাকড়াশীবাবুর বৌ এদের সবারই তো মনে হচ্ছে ল্যাজ আছে। পুরোহিতমশাইয়ের নাতিটার দাঁতগুলোও যেন কেমন। তার নিজের তো চোখ দুটোও তো ভাঁটার মতো। এমনকি এখনতো সন্দেহ হচ্ছে ঘোষেদের গরুগুলো অবধি যেন—
     গবু নানারকম কথা ভাবতে ভাবতে চলছিল। সত্যরঞ্জনবাবু একটু তফাতে বীরদর্পে এগিয়ে চলেছেন। বড়রাস্তায় কালীমন্দিরের সামনে পৌঁছে গবু লক্ষ্য করল সত্যরঞ্জন বাজারের দিকে না গিয়ে উলটো দিকের মেঠো রাস্তা ধরলেন। গবু তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে বলল, ইয়ে রাস্তাটা একটু ভুল হয়ে যাচ্ছে নাকি?
একদম না।
কিন্তু বাজারচক, কালীগঞ্জের হাট, রেলস্টেশন সবই তো অন্যদিকে।
আমরা ওসব জায়গায় যাচ্ছি না।
গবু একটু অবাক হয়ে বলল, তাহলে আমরা যাচ্ছি কোথায়?
ট্যাঁক থেকে নোটবইটা বের করে সত্যরঞ্জন ভুরু নাচিয়ে বললেন, আমরা যাচ্ছি হরিশরাজার জঙ্গলে। সোজা গুপ্তধন উদ্ধার করে হাজির করব বুঝলি। এ হল যাকে বলে হৃতসম্মান পুনরুদ্ধার। আমাকে কিনা পিসেমশাইয়ের ভয় দেখায়।
—‘কিন্তু গুপ্তধন যে আছেই, সেটা বুঝছেন কী করে?’
—‘আরে আছে রে আছে। বড় বড় জমিদারবাড়ীতে অমন একটু আধটু থাকে। দেখিস না গোয়েন্দারা কেমন ক্লু খুঁজে বার করে সেসব উদ্ধার করে। তাছাড়া রাজা বাদশাদের অমন শখ আহ্লাদ থাকত। গল্পে পড়িস নি কতকালের পুরোনো পায়রার ডিমের মতো সাদাসাদা গোলগোল হীরে মুক্তো যা কিনা শোবার ঘরের লোহার সিন্দুকে রাখলেই ল্যাঠা চুকে যায়, তা কিনা কত ভেবে চিন্তে মাটির নীচে চোরকুঠুরির ভেতর ওরা লুকিয়ে রাখে। আবার জামাই-ঠকানো ছড়া কেটে সেসবের হদিস বাতলানো থাকে। অমন সুন্দর হরিশরাজার বন লুকোনোর জায়গা হিসেবে খারাপ কি তা তুই বল। আমি, ইয়ে কি বল, বেশ গুপ্তধনের গন্ধ পাচ্ছি বুঝলি।’
গবু একটু চিন্তিত মুখে বলল, আরো লোকলস্কর নিয়ে গেলে হত না। তাছাড়া গতকাল অমন তেনাদের দেখা পাওয়ার পর—
হ্যাং ইয়োর ভূত এটসেটরা। কাউকে বলার দরকার নেই। জানতে পারলেই সব ভাগ বসাতে আসবে। খবরদার বলে দিচ্ছি কাউকে কিন্তু কিছু বলবি না।
যে আজ্ঞে।
ভাগ্যিস কাল রাতে নকশাটা নোটবইতে হাতসাফাই করেছিলুম। না হলে নেহাত আপশোস করতে হত। আচ্ছা তোর কী মনে হয় ওটা কী ছিল? ব্রক্ষ্মদত্যি?
গবু মাথা চুলকে বলল, ইয়ে তা কি করে হবে? খুড়ো তো বামুন নয়। তাছাড়া ব্রক্ষ্মদত্যির অমন সবুজ রঙা মুন্ডু হয় নাকি?
তা ঠিক। যাক গে। কালকের ঘটনার পর আমি নিশ্চিত যে হরিশরাজার জঙ্গলে কিছু একটা আছে। সে রহস্য আমিই উদ্ধার করব। গোটা হাঁসপুকুরে বুঝলি একেবারে হৈ চৈ পড়ে যাবে। তারপর ঐ পিসে আর তার ভাইঝিকে দেখে নেব।
আজ্ঞে একশবার। তবে কাউকে জানিয়ে গেলে হত না? নিতান্তই দেহত্যাগ করতে হলে কেউ তবু খবর পেত।
সত্যরঞ্জন গম্ভীর হয়ে বললেন, দেখ এসব আনাড়িদের কর্ম নয়। অত্যন্ত চৌকশ না হলে মুশকিল। আর আমি একেবারে নিশ্চিত যে গোটা হাঁসপুকুর জুড়ে আমার মত এক্সপার্ট আর কেউ নেই। তাছাড়া দিনমানে রওনা দিচ্ছি। ভয়ের কিছু নেই। আর শুনিসনি কাল ভূতটা পরিস্কার বলল হাজার খানেক সোনার মোহর আছে। সেসব দুজনে মিলে বমাল সমেত নিয়ে ফিরলে গঞ্জে কেমন খাতির হবে বুঝেছিস?
আজ্ঞে সে সব তো বুঝলাম, কিন্তু ভূতপ্রেতের কথায় আমল দেওয়া কি উচিত হচ্ছে?
ইস, আমল দেব না তো কি। জানিস ওরা ত্রিকালদর্শী হয়। ওদের মিথ্যে বলা বারন। কি সব নিয়মকানুন আছে। বড় বড় গোয়েন্দারা রহস্যের কিনারা করতে ওঁদের হেল্প নেয় তা জানিস। এখন তো আমার এমনও মনে হচ্ছে যে ভূতটা নেহাত আমাকে চিনতে পেরেই ওরকম সাঁটে হদিশ বলেছে।
তাই বুঝি!
আলবাত। নে এখন তাড়াতাড়ি পা চালা। কাকপক্ষী টের পাওয়ার আগেই সরে পড়ি।
      দুজনে মিলে শিশিরে ভেজা মেঠো পথ ধরে দ্রুত চলতে লাগলেন। আস্তে আস্তে বেলা বাড়ছে। দূরে ধানক্ষেতের উপর দুধের সরের মতো জমে থাকা কুয়াশা ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে। ফটিকদের বাঁশবনের ভেতর থেকে রাতপাখি ডেকে উঠল।
      বুনো আগাছার ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে ধড়িবাজ বিশু ওদের চলে যাওয়া নিবিষ্ট মনে লক্ষ্য করল। ঐ মেঠোপথ খেত ছাড়িয়ে রসিকবিলের পাশ দিয়ে কোথায় গিয়ে শেষ হয় তা সে বিলক্ষন জানে। কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পর সে উর্দ্ধশ্বাসে দৌড় দিল চন্ডীমন্ডপের দিকে।

No comments:

Post a Comment