হরিশরাজার জঙ্গলের উপর দিয়ে সূর্য্য ঢলে পড়ল। নিঝুম শিরশিরানি হাওয়া বইছে। জঙ্গল থেকে একটা দুটো শেয়ালের হুক্কা হুয়া শোনা যাচ্ছে। এমন সময় হাঁসপুকুরের যত ঝোপে ঝাড়ে ঝিঁ ঝিঁ পোকারা একসাথে ডেকে উঠল, আর অমনি গবু একটা লন্ঠনে কালো কাপড় জড়িয়ে, খিড়কির দরজা খুলে চুপিসাড়ে বাইরে বেরিয়ে এল।
ঘুটঘুটে অন্ধকার। যদিও আকাশে চাঁদ আছে। চবুতরা পেরিয়ে, বনমালীবাবুর বাড়ীর পাশ দিয়ে দ্রুত পা চালিয়ে সে বড় রাস্তায় এসে পড়ল। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সামান্য আলো রাস্তায় এসে পড়েছে। ঐ যে দূরে গগনবাবুর বাড়ীর জানালা দেখা যাচ্ছে। গবু দেখল গগনবাবু পিসীমার হাত থেকে কী একটা খেলেন। ঝিঁ ঝিঁ ডাকছে তারস্বরে। আরো একটু এগোতেই চন্ডীমন্ডপ পড়ল। কবিরাজমশাই শতদল ঘোষের সাথে নিচু স্বরে কীসব ষড়যন্ত্র করছেন। যথাসম্ভব আড়াল রেখে সে চন্ডীমন্ডপ পেরিয়ে বাজার চকের দিকে এগোলো। দোকানপাট সব বন্ধ, চারিদিক নিঝুম হয়ে রয়েছে। খালি গাছের পাতায় হাওয়া সরসর আওয়াজ তুলছে। কালু ষাঁড়টা বসে আছে না? নিঃশব্দে বাজার চক পেরিয়ে সে ফটিক ঘোষের বাঁশবাগানের দিকে এগোলো। বাঁশবাগানের পাশে গদাইপালোয়ানের কুস্তির আখড়া পেরিয়ে, গুটিকতক সারি সারি বাড়ীঘর পেরিয়ে নিচু ঘাসজমি ডিঙিয়ে সে ফের বনমালীবাবুর ঘরের কাছে এসে পড়ে হাঁফ ছাড়ল, তাকে কেউ দেখেনি। বনমালীবাবুর ঘরে এখন কুপী জ্বলছে, শুঁটকি মাছ রান্নার গন্ধ ভেসে আসছে। নাকে হাত চাপা দিয়ে কোনমতে চবুতরা পেরিয়ে খিড়কির দরজা দিয়ে ঢুকে, তার ঘরের ঠিক পাশের ঘরটিতে সে কড়া নাড়ল। পাশের ঘরে যাওয়ার জন্য অবশ্য এতটা ঘোরার দরকার ছিল না, কিন্তু একটু অ্যাডভেঞ্চার ছাড়া কি আর গোয়েন্দাগিরি মানায়।
ডিটেকটিভ সত্যরঞ্জন চাকলাদার একটা আলোয়ান গায়ে দিয়ে বেরিয়ে এলেন। চোখেমুখে বিরক্তি, ‘তোকে বলেছিলাম না রাত বারোটার আগে দরজা ঠকঠকাবি না।’
—‘ইয়ে খবরগুলো আর চেপে রাখতে পারছিলাম না।’
—‘কি খবর পেলি?’
—‘আজ্ঞে প্রচুর খবর পেলুম। ইয়ে, এখানে বড় ঠান্ডা, আমার ঘরে আসুন।’
দুজনে মিলে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলেন। লন্ঠনের কালো মোড়ক খুলে দিতে ঘর একটু উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মফস্বলের এসব দিকে এমন সময় ঠান্ডা তেমন জমিয়ে পড়ে না, তবে এবার যেন একটু তাড়াতাড়িই শীত এসে পড়েছে।
—‘ইয়ে, আজ ফটিকবাবুর বাঁশবনে আড়ি পেতেছিলাম।’
—‘তারপর?’
—‘তারপর যা হ্ল, তা দেখলাম বেশ রোমহর্ষক, যাকে বলে একেবারে সত্যিকারের গায়ে—’
সত্যরঞ্জন রেগে গিয়ে বললেন, ‘ধানাইপানাই ছেড়ে আসল কথা বলবি কি না?’
গবু ব্যস্তসমস্ত হয়ে উঠে বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, তারপর শোনেন, সকালবেলার ঘটনা। তখন সবে রাস্তা দিয়ে লোকচলাচল শুরু হয়েছে, পষ্ট দেখলাম, ফটিকদের বাঁশবাগানের পাশে জগা পাগলা আর গোবিন্দখুড়ো আড়ালে খাটো গলায় কি যেন ষড়যন্ত্র করছে।’
—‘কিছু শুনতে পেলি নাকি?’
—‘আজ্ঞে মনে হল, হরিশরাজার জঙ্গল নিয়ে কিছু কথা হচ্ছিল। সেখানে নাকি কারা সব আছে, তারা নাকি ঘন্টা বাজায়। আর খুড়োর নাকি কিসের উপর হাত বোলাতে খুব ইচ্ছে করে।’
‘ধ্যাৎ, কিসব আজে বাজে বলছিস।’ সত্যরঞ্জন ভ্রু কোঁচকালেন।
—‘আজ্ঞে, একেবারে নিয্যস সত্যি কথা বটে, কিসব কাঁকড়ার গর্তের ভেতর ট্যাঁকঘড়ি, আর যখের ধনের কথাও শুনলাম যেন।’
‘ঠিক শুনেছিস!’ উত্তেজনায় সত্যরঞ্জনের চুল খাড়া খাড়া হয়ে উঠল।
—‘তাই তো মনে হল। আর, ইয়ে, এখানেই শেষ নয় গোবিন্দখুড়ো দেখলাম শেষে ভিরমি খেয়ে উলটে পড়ল।’
—‘ভিরমি খেল, অ্যাঁ, কিন্তু ভিরমি খাবে কেন?’
—‘ইয়ে তা তো জানি না, তবে আমিই তো আবার চোপা চোপা জল ঢেলে ওনার মুচ্ছো ভাঙালাম, যদিও মুচ্ছো ভেঙে উঠে বসে আমাকে দেখে খানিক গালমন্দ করে চলে গেলেন।’
—‘হ্যাঁরে, এক শুনতে গিয়ে আরেক শুনিসনি তো?’
—‘এক শুনতে গিয়ে আরেক? ব্যাপারটা কিরকম বলুন তো, ও ও ও, বুঝেছি সেই গেল বছরের সেই গোরুদের—’
সত্যরঞ্জন গবুর দিকে রক্তচক্ষু করে বললেন, ‘উফফফ। তোকে বারণ করেছি না যে ওইসব কথা আমাকে মনে করাবি না। যাক গে আর কি শুনলি?’
—‘ইয়ে, ওখানে তারপর বড্ড মশা কামড়াচ্ছিল তাই, গগনবাবুর বাড়ীতে আড়ি পেতে বসেছিলাম।’
—‘কেন কেন? গগনবাবুর বাড়ীতে কেন?’
—‘আজ্ঞে ওনার চাকর ঝিকু কাল থেকে উধাও হয়েছে। তাই ভাবলাম—’
সত্যরঞ্জন গবুকে হাত তুলে থামিয়ে একটু তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন, ‘রোসো, আড়ি পেতে বড়জোর শুনেছিস যে গগনের সোনার জরি দেওয়া অতবড় পানবাটাটা হারিয়েছে আর সেজন্য নির্ঘাত ঝিকুকে ওরা সন্দেহ করে। হয়তো এটাও শুনেছিস ওর বৌয়ের জন্য রুপোর নাকছাবি, তারপর ওর পিসীমার সোনার কানের দুল, এসবও হারিয়েছে। হাঃ হাঃ, আরে বলেই ফেল না, গগনের পিসীর মুখ হাঁড়ি হয়ে আছে আর তার সঙ্গে এটাও দেখে ফেলেছিস যে পিসীকে ধোঁকা দিয়ে গগন চালের বস্তার মধ্যে লুকোনো নতুন কেনা খাস্তা বিস্কুটের প্যাকেট টা সাবাড় করছে।’
—‘আজ্ঞে এরকম তো কিছু দেখলাম না। খালি দেখলাম গগনবাবু থেকে থেকে মোগলাই পরোটা বলে ডুকরে কেঁদে উঠছেন, আর পিসীমা দেখলাম ঐ পানের বাটা যেটা বলছেন ওখান থেকে থোকা থোকা পান দোক্তা চিবুচ্ছেন। দুখানা দাসী পদসেবা করছে, আর রান্নাঘরের কুলুঙ্গিতে ওদের হুলোটাকেও দেখলাম যেন বলে মনে হল।’
সত্যরঞ্জন এবার একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘শুধু হাঁ করে দেখলেই হয় না, কি কি দেখা উচিত আর কি কি নয় সেসবের একটা লিস্ট বানিয়ে নিয়ে যেতে হয়, নইলে বুদ্ধু বনতে হয়। এই যেমন ধর তুই দেখতে চাইছিস জমিদারবাড়ির অন্দরমহলে কার গলায় পান্না দেওয়া জড়োয়া ঝুলছে, তার বদলে দেখলি জমিদারগিন্নী ঘুঁটে শুকোচ্ছেন, কাপড় কাচছেন। মনে কর দেখতে চাইছিস গলির ভেতর গুম খুন, বদলে দেখে ফেললি ছানাবাঁদরে উকুন বাছছে। তারপর যা দেখছিস ঠিক সেটাই ঘটছে কিনা সেটাও বাজিয়ে দেখা দরকার। এবিষয়ে বড় বড় গোয়েন্দাদের যা মত, আমারও ঠিক তাই। আমি বলি কী যে যা ভালো বুঝছে সেটাই করছে, তবে আমরা যেটা দেখছি সেটা ভালো করে বুঝছি না—, না না, কথাটা অন্যরকম হবে মনে হচ্ছে, মানে আমরা যেটা ভালো বুঝছি না সেটাই সবাই করছে—না না, এরকমও তো নয়, মানে আমরা যেটা করছি না সেটাই সবাই ভালো বুঝছে—যাচ্ছলে, এরকমও তো ছিল না, যাকগে ইয়ে আর কি দেখলি?’
গবু চোখ পিটপিট করে বলল, ‘আর দেখলাম কবিরাজমশাই অঙ্ক স্যারের বাড়ী গেলেন?’
—‘গুপী মাস্টারের বাড়ী।’
—‘আজ্ঞে হ্যাঁ, নিচু গলায় কিসব শলা পরামর্শ হচ্ছিল। দোরের বাইরে আড়ি পেতে খুব ভাল কিছু শুনতে পেলুম না। তবে এইটুকু শুনলুম, হরিশরাজার জঙ্গলে নাকি সিংহের গুহা আছে, আর সেখানে বিস্তর আংটি, গয়না লুকোনো আছে, আর গোবিন্দখুড়ো সেখানে নাকি বসে বসে আঁক কষে।’
—‘আঁক কষে?’
—‘ইয়ে, তাইতো শুনলুম।’
সত্যরঞ্জন চিন্তায় পড়লেন। হরিশরাজার জঙ্গলে গিয়ে সিংহের গুহায় বসে আঁক কষার ব্যাপারটা যেন কেমন ঠেকছে। অবশ্য সত্যকারের ডিটেকটিভদের সামনেই তো যত রহস্যের ঘনঘটা তৈরী হয়। কায়দা করে ক্লু খুঁজে পেয়ে ওরা কেমন বেয়াদবদের ধরে বার করে। সেই যে পুলিশরা কিছুতেই খুঁজে পায় না, আর গোয়েন্দারা কেমন একটা মাত্র ভাঙা হুঁকোর টিকে থেকে গন্ধ পেয়ে, কচুগাছের তলায় আধপোড়া বিড়ি খুঁজে পেয়ে সব কিছু বলে দেয়। মায় চোরেদের জামার হাতার রঙ অবধি। অবশ্য তার জন্য সত্যিকারের সুত্র চাই। এলেবেলে কিছু দিয়ে হবে না। যতক্ষন না কোন নৃসিংহ মূর্তির ভাঙা কানের পাশে রক্তের দাগ দেখা যাচ্ছে, কিংবা ভাঁড়ার ঘরের দেওয়ালে চাবি দিয়ে আঁকাবাঁকা হাতে পানু প্লাস ভুত লেখা বের হচ্ছে, ততক্ষন কিচ্ছুটি হবার নয়।
গবু একটু মাথা চুলকে বলল, ‘আচ্ছা কর্তা, একটা কথা বলব?’
—‘বল।’
—‘ইয়ে, কবিরাজমশাই অঙ্ক স্যার কে গোবিন্দখুড়োর ল্যাজের কথা বলছিলেন বলে মনে হল।’
—‘ল্যাজ? ঠিক শুনেছিস!’
—‘আজ্ঞে হ্যাঁ। পষ্ট শুনলাম যেন কবরেজমশাই বলছেন, খুড়োর ল্যাজ নাকি খুড়োর বাড়ীর বৈঠকখানায় রাখা থাকে। অঙ্ক স্যার সেটা নাকি আবার ডোনেশন চেয়েছেন।’
সত্যরঞ্জনের চক্ষুস্থির! সাধারন মানুষের ল্যাজ থাকে নাকি। অবশ্য খুড়ো কে দেখে কোনদিনই তাঁর ঠিক সুবিধের লোক বলে মনে হয়নি। উকিলবাবুর চেম্বারে বসে একঘর লোকের সামনে সত্যরঞ্জনকে যে লোক অকর্মার ঢেঁকি বলে, গোয়েন্দাগল্পের চেয়ে ঢ্যাঁড়শভাতে যার প্রিয়, দুগ্ধবরন দারোগার সাথে হাত মিলিয়ে যিনি কালীগঞ্জের হাটে গোরুগুলোর সামনে অবধি অপমান করেন তাঁর শুধু ল্যাজ কেন শিং থাকাও উচিত।
খুড়োই সব রহস্যের মূলে মনে হচ্ছে। এক নম্বর রহস্য, এই যে তাঁর বাড়ীর পাশে নতুন ধরনের দেশলাই পাওয়া গেল। তারপর ধর গগনবাবুর চাকর গায়েব। তিন নম্বর, হরিশরাজার জঙ্গলে যখের ধন, সেখানে আবার সিংহের গুহা। আর গুহার ভেতর বসে মিচকে হাসি হেসে গোবিন্দখুড়ো আঁক কষছে। অবশ্য খুড়োর ল্যাজের কথাটাও ধরতে হবে।
সত্যরঞ্জন উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। এসবের সমাধান করতে পারলে হাঁসপুকুরে তাঁর সুনাম প্রতিষ্টিত হতে বাধা কোথায়? দারোগাবাবুকে তিনি তখন দেখে নেবেন। খুড়োকেও। চন্ডীমন্ডপে এখন যারা তাঁকে সামনের সারিতে বসতে দেয় না, তাঁরাও তখন তাঁকে মুখ চুন করে জায়গা ছেড়ে দেবে। চাইকি শহর থেকে কাগজওয়ালাদের আসতেই বা আটকাচ্ছে কে। তাঁকে নিয়ে ইন্টারভিউ ছাপা হবে। বাজারচকের ঠিক মধ্যিখানে তিনি দপ্তর খুলবেন। উপরে হোর্ডিং থাকবে ‘সত্যরঞ্জনের সত্যদর্শন, সঠিক দামে সেরা পরিষেবা’।
শীত বাড়ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শেয়ালের ডাক। খিড়কির পেছনে ঝিঁ ঝিঁ পোকার শব্দও ক্রমশ বাড়ছে। সত্যরঞ্জন চাকলাদার বেশ বুঝতে পারছেন গোবিন্দখুড়োর ওপর অনুসন্ধানের দরকার। কিন্তু আজ রাতে এই সময় তা হবে কী?
গবুর জামার আস্তিন খামচে ধরে তিনি নীচু স্বরে বলতে লাগলেন, ‘শোন, এখন ঘরে যা। কাল রাত দুপুরে ক্লু এর খোঁজে বেরোতে হবে।’
—‘যে আজ্ঞে, কিন্তু কোথায় যাব যদি বলেন।’
—‘গোবিন্দখুড়োর বাড়ীতে। লুকিয়ে যেতে হবে, খুড়ো যেন টের না পায়।’
—‘ইয়ে, অতরাতে খুড়ো দরজা না খুললে?’
—‘ইডিয়ট! ওই যাকে বলে ট্রেসপাশিং, তাই করতে হবে।’
—‘সে আবার কী। ও ও ও বুঝেছি, সেই গতবারের মতন গোরুদের গোয়ালে—’
—‘চুপ করবি! আর তাছাড়া তোকে অত মাথা ঘামাতে হবে না। আমি তো তোর সঙ্গে থাকব রে গর্দভ।’
—‘বুঝেছি।’
—‘আচ্ছা এখন যা। ওভার এন্ড আউট।’
No comments:
Post a Comment