Thursday, 15 December 2011

বব উইলিস ও একটি কালো কোটের গল্প- পর্ব ৩

     বব উইলিসের দোতলার ঘরে যদি আপনি কোনকালে পা রাখেন তো প্রথমেই আপনার চোখে পড়বে একটা পুরু গদিওয়ালা বিছানা, সেই সঙ্গে টেবিলের উপর একটা কাঁচের জারের মধ্যে গোল্ডফিশ, দেওয়ালে ওয়ালরথ পাইপ রেঞ্চ কোম্পানির ক্যালেন্ডার। এছাড়া আশেপাশে চোখ বুলোলে দেখতে পাবেন একটা সস্তা কাঠের আলমারি এবং ববের সাধের ইজিচেয়ার যার উপর একটা ময়লা তোয়ালে রাখা। এই সব দেখে যখন আপনি ভাবছেন যে বব মানুষটি ভীষণ সাদাসিধে ঠিক তখনই আপনার চোখে পড়বে ঘরের এককোনায় রাখা বইয়ের র‌্যাক যেটি দর্শনের বইয়ে ঠাসা এবং তৎক্ষনাৎ আপনি বব সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত বদলাবেন। কিন্তু আসল ব্যাপার হল এসব বই সে কোনোকালেই পড়ে না, ওগুলো নিতান্তই তার পৈতৃক সম্পত্তি।
     বব শুধু বিছানায় শুয়ে কোলিয়ারীর ইউনিয়নের সাপ্তাহিক মুখপত্র পড়তে ভালবাসে কেননা সে এটা প্রায় ছোটোবেলা থেকেই পড়ে আসছে। চুপ করে বিছানায় শুয়ে সিলিং এর দিকে চেয়ে বহুদিন আগেকার ‘দি লেবার উইকলি’র পাতায় চুল রঙ্গীন করার বিজ্ঞাপন, কিংবা ব্যালেরিনাদের ছবির কথা ভাবা তার বহুদিনের অভ্যাস। তার মনে পড়ে গ্যারি শেফার্ডের জাঁকালো জোক্‌সগুলোর কথাও, কিন্তু শীতকালে সেসবে সে বিরক্ত বোধ করে। মাঝে মাঝে অলস ভাবে বিছানায় শুয়ে ববের নিজেকে মনে হয় কারাগারের বন্দী যেখানে তার সঙ্গী বলতে কেবল তার হাতঘড়ি এবং তার বিছানা। তার বহুদিনকার পুরনো বিছানা যেখানে এখন নিগ্রো বুড়োটা কোট জুতো সমেত শুয়ে আছে।
     ঘরের আলোয় বুড়োকে ভালো করে লক্ষ্য করল বব। কোলকুঁজো চেহারা। মুখখানা হাঁ করে হাপরের মতো শ্বাস নিচ্ছে। সাদা দাড়ির সাথে বরফকুচি মিশে আছে। ববের মনে হল থিয়েটারে ওকে বুড়ো চাকরের ভূমিকায় ভালো মানাবে।
‘এই তবে ব্যাপার, তা আমাকে খুলে বলতে পারো সব।’ বব ফায়ারপ্লেসের চুল্লীতে কাঠকয়লা গুঁজতে লাগল। ঘর আরো একটু গরম হলে যদি বুড়োর হুঁশ ফেরে।
বৃদ্ধ লোকটি অবশ্য একইরকম ভাবে শুয়ে রইল। পা দু’টো মুড়ে একটা হাত মাথার পেছনে দিয়ে একপাশে কাত হয়ে। চোখ দু’টো বোজা। ওর সারা শরীর এমনভাবে কোটে ঢাকা যে দেখে মনে হচ্ছে একতাল কালো কাপড় যেন কেউ দলা পাকিয়ে ফেলে রেখেছে। ববের একবার মনে হল কোনো ডাক্তারকে ডেকে আনার কথা। তার উপরতলাতেই তো একজন আছে, সবসময় সাদা পোশাক পরা ফিটফাট ছোকরা ডাক্তার। কিন্তু ফি দেওয়ার ক্ষমতা ববের নেই, তাছাড়া কালো মানুষ দেখে সে ছোকরা নাক সিঁটকে চলেও যেতে পারে।
—‘ওর দরকার পথ্য, আর সেটা আমিই জোগাড় করতে পারব। বলা যায় না কিছুটা খাবার খেলেই হয়তো ও সুস্থ বোধ করবে।’
জানালার সার্সিগুলো ভালো করে এঁটে দিল বব। নিজের কম্বলটা ওর কোটের ওপর চাপিয়ে দিল যাতে বুড়ো একটু আরাম পায়।
—‘ও নিশ্চয় আমাকে দেবদূত ভাবছে। ভাববে নাই বা কেন? এখনো অবধি যে ও বেঁচে আছে সে তো আমারই জন্য। কোনো সন্দেহ নেই, ঈশ্বর ব্যাপারটা লক্ষ্য করছেন।’
     চুল্লীতে আরও কিছু শুকনো কাঠ গুঁজে দিল বব। যতটুকু কাঠকয়লা সে সারা সপ্তাহের জন্য বাঁচাতে পেরেছিল তার প্রায় সবটুকুই। আরো উত্তাপ চাই। তাহলে বুড়োটা হয়তো গা হাত পায় জোর ফিরে পাবে। হয়তো উঠে বসে সে ববকে তার প্রাণ বাঁচানোর জন্য ধন্যবাদ জানাবে এবং বলবে আসলে সে জর্জটাউনে এসেছিল হার্লেম শহরের খবর নিয়ে। হয়তো এও বলবে যে তার মাছের স্যুপ ভালো লাগে না, সুতরাং বব যেন অন্য ব্যবস্থা করে। ফায়ার প্লেসের ধারে তার প্রিয় আরামকেদারাটা টেনে নিয়ে আগুনের উত্তাপে হাত পা সেঁকতে সেঁকতে বব কল্পনা করছিল, বুড়ো কৃতজ্ঞতা জড়ানো মুখে তার হাতে চুমু খাচ্ছে।
     এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ হল এবং বব এমনভাবে লাফিয়ে উঠল যেন সে এরই প্রত্যাশা করছিল।
—‘আসুন মিসেস হিগিন্‌স, আমি আপনার আসার অপেক্ষাতেই ছিলাম। মিঃ হিগিন্‌স রেওয়াজে ব্যস্ত বুঝি!’
—‘ওহ্‌, বব! সবই তো বোঝ। আচ্ছা, দেখো কিছুটা শুকনো মাংসই কেবল আমি তোমাকে দিতে পারি। আর এই কিছুটা মদ।’
—‘অশেষ ধন্যবাদ, আশা করব এতটাই আমাদের অতিথির জন্য যথেষ্ট।’
মিসেস হিগিন্‌স টেবিলের উপর কাঠের রেকাবিটা রেখে একটু ইতঃস্তত করে বললেন, ‘বড়দিনের ছুটিতে আশা করি তুমি মেরীকে ঘোড়ায় চড়া শেখাতে পারবে?’
—‘সানন্দে। একাজের জন্য মিঃ হিগিন্‌সের খামারবাড়িটাই আমি উপযুক্ত মনে করি।’
মিসেস হিগিন্‌সের মুখ একটু রক্তাভ হল। অস্বস্তির হাসি হেসে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
নিগ্রো বুড়োটা চোখ মেলে তাকিয়েছে। এখন আর ঘোলাটে দৃষ্টি নয়। কিছু যেন খুঁজছে। বব বিছানার পাশে গিয়ে বুড়োর মুখের উপর ঝুঁকে পড়ল।
—‘তুমি চাইলেই মাংসের টুকরোটা খেতে পার। কিছুটা মদও আছে।’
বুড়ো বিড়বিড় করে কিছু একটা বলল। ববকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে কি?
—‘দেখ নেহাত আমাকে চেস্টারের পাবে যেতেই হবে সে কারণে এক্ষুনি তোমার খিদমত করতে পারছি না। তুমি কিছু বলতে চাও কি? অন্তত নামটুকুও বলতে তো পার।’
বুড়ো চুপ করে রইল। ঠোঁট দুটো অল্প ফাঁক করা।
—‘বেশ যেমন তোমার মর্জি। দেখ, আমি সাধারণত বেশী মদ খাই না, তবে আজকের কথা বলতে পারছি না। শোনো, নিচের একতলায় ওরা বসে আছে, কিছু প্রয়োজন পড়লে বেল বাজিয়ে বুড়ীটাকে ডেকো। ওর নাম মিসেস হিগিন্‌স তবে তুমি উইলেলা বলে স্বচ্ছন্দে ডাকতে পার।’
বাইরে এখনো বরফ পড়া থামেনি। সেদিকে চেয়ে হতাশ হয়ে বব তার হাতের দস্তানাটা আগুনের তাপে সেঁকতে লাগল। মন অন্যমনস্ক। শীতকালে এইরকম বরফ পড়া সন্ধ্যায় সে সাধারণত একতলায় বসে মিসেস হিগিন্‌সের সাথে নানান টুকিটাকি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। জর্জটাউনে সবজির আমদানী, পিয়ানোর কনসার্ট, ধর্মালোচনা বা ঈশ্বর কত করুণাময় ইত্যাদি। আজ সে বেশ প্রশান্তি অনুভব করছিল কেননা এরপর থেকে কেউ হয়তো রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় তাকে দেখিয়ে বলবে, ঐ যে বব উইলিস, একটা নিগ্রো বুড়োকে যে প্রাণে বাঁচিয়েছে। হয়তো শেরিফ তাকে একটা প্রশংসাপত্র লিখে দেবেন, ‘বব উইলিস…অমুক তারিখে অমুক ইত্যাদি’। নিজের মধ্যে মহতী গুণ আবিষ্কার করে বব একটু অবাক না হয়ে পারল না। সে তাহলে লোক খারাপ নয়।
     একটা শিস দিয়ে উঠল বব। নিজের প্রতি তার ভীষণ গর্ব হচ্ছে। দ্রুত গরম জামাকাপড় পরে ঘর থেকে বেরিয়ে এল বব। তার দরকার একটু খোশগল্প এবং দুপাত্তর পান। একতলায় সোফায় বসে মিসেস হিগিন্‌স তাঁর বোনঝিকে সোয়েটার বোনা শেখাচ্ছিলেন। সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ পেয়ে দেখলেন, বব উইলিস নেমে আসছে। এক, দুই…এক, দুই, বেশ ছন্দ করে ক্যাঁচক্যাঁচিয়ে উঠছে কাঠের সিঁড়ি। মিসেস হিগিন্‌স ও আওয়াজ বিলক্ষণ চেনেন। ওর মানে বব উইলিস এখন ভরপুর আনন্দে মশগুল।

No comments:

Post a Comment