সিঁড়ি দিয়ে প্রায় নিঃশব্দে উঠে যাচ্ছিল বব। একতলায় টি টেবিলের সামনে মিসেস হিগিন্স এখনো বসে আছেন। টেবিলের উপর চা ও রুটির টুকরো রাখা। ওঁর প্রিয় বেড়ালটি ওঁর কোলের উপর শুয়ে ঝিমোচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে উনি নির্লিপ্তভাবে সোয়েটারের ঘরের মাপ পরখ করছিলেন তবুও কাঠের সিঁড়ির হতাশ ক্যাঁচকোঁচ শব্দ তাঁর কান এড়াল না। এর মানে হচ্ছে বব উইলিস বিমর্ষ।
—‘সব কিছু ঠিক আছে তো বব? আমি কিছু সাহায্য করতে পারি?’
—‘ধন্যবাদ, মিসেস হিগিন্স, আশা করব কাল সকালের আগে আপনার দরকার পড়বে না।’
‘দেখো বব’, মিসেস হিগিন্স হাতের কাজ থামালেন, ‘আমি চাই না তুমি কোনো ঝামেলায় জড়াও। আমার মনে হয় বুড়োটাকে যত তাড়াতাড়ি পারা যায় বিদায় করাই ভালো।’
বব মাথা নীচু করে বলল, ‘আমি অবশ্যই চেষ্টা করব। আশা করছি কাল সকালে—’
—‘দেখ আমাকে পাদ্রীসাহেব বলেছেন, এরা ভীষণ অকৃতজ্ঞ হয়। তাছাড়া কানাঘুষোয় শোনা যাচ্ছে যে নিগাররা নাকি বলশেভিকদের দেখাদেখি গোলমাল করার চেষ্টা করছে। শুনছি সরকার থেকে প্রচুর ধরপাকড় আরম্ভ হয়েছে। কাগজে কি লিখেছে শোনো, ‘আমেরিকা আমেরিকানদের জন্য’।’
—‘আমি বিস্মিত হলাম মিসেস হিগিন্স, তবে এ লোকটা নেহাতই গোবেচারা।’
‘তাই যেন হয় বব, তবে আমার কথাটা মনে রেখো’, মিসেস হিগিন্স উঠে দাঁড়ালেন, ‘শুভরাত্রি বব।’
—‘শুভরাত্রি মিসেস হিগিন্স।’
বব বিষন্ন মনে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে নিজের ঘরের দরজার হাতল ঘোরালো। নিগ্রোটার হুঁশ ফিরেছে কি? মাংসের টুকরোটা কি খেয়েছে ও?
দরজা খুলে ঘরে ঢুকতেই একরাশ চমক ববের জন্য অপেক্ষা করছিল। এ চমক ক্রিসমাসের উপহার পাওয়ার আনন্দের মতো নয়, বা কয়লাখনির ভিতর পাথর খুঁড়ে হঠাৎ একটুকরো হীরে পাওয়ার উত্তেজনার মতোও নয়, এ অন্যরকম অনুভুতি। শীতের রাতে প্রথম তুষারপাতের পর সকালে ঘুম থেকে উঠেই কোন ঘুঘু পাখিকে জানালার পাশে মরে পড়ে থাকতে দেখার মতো। বব প্রথমে ব্যাপারটা ঠিক অনুধাবন করতে পারেনি। কিন্তু মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে থাকা নিস্পন্দিত দেহ, নিস্পলক চোখ, মুখের কষ বেয়ে নামা ফেনা, হাত থেকে ছিটকে পড়া মাংসের টুকরো ববকে প্রায় ঘাড় ধরে বুঝিয়ে দিল যে সে এই মুহূর্তে একটি নিগ্রো মানুষের মৃতদেহের দিকে চেয়ে আছে।
হা ঈশ্বর! বব মৃদু স্বরে ডুকরে উঠল। ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে নিগ্রো বুড়োটার গায়ে পা দিয়ে একটু খোঁচা মারল সে। দেহটা নড়ল না, কোনো সন্দেহ নেই এতক্ষণে বুড়ো স্বর্গে পৌঁছেছে। অবশ্য ওর গায়ের রঙ তো কালো, ওরও কি স্বর্গে যাওয়ার কথা?
ও হয়তো উঠে এসে মাংসটা খাওয়ার চেষ্টা করেছিল, সিদ্ধান্ত করল বব। বহুদিনের অভুক্ত শরীর আর সইতে পারে নি। হয়তো শেষ মুহূর্তে ঐ মাংসের টুকরোর দিকে চেয়েই ও মারা গেছে। এমনও হতে পারে যে ও ববকে ডাকার চেষ্টা করেছিলো। হয়তো নিচের তলায় মিসেস হিগিন্স ওর আর্তনাদ শুনতে পাননি। তাছাড়া শুনতে পেলেও কোনোও লাভ হত কি?
কিন্তু এবার কি হবে? বব শিউরে উঠল। এই নিগ্রোটার মৃতদেহ নিয়ে কি করবে সে এখন? ভয়ভাবনায় তার কান্ডজ্ঞান লোপ পাচ্ছে। তড়িঘড়ি সে সিঁড়ির উপর থেকে চিৎকার করে মিসেস হিগিন্সকে ডাকল। অবশ্য খুব জোরে চেঁচাতে সে সাহস পেল না কারণ সে চাইছিল না অন্য বোর্ডাররা ব্যাপারটা জানুক।
মিসেস হিগিন্স রাতপোশাকের উপর একটা ওভারকোট মতন চড়িয়ে হলঘরে বেরিয়ে এলেন।
—‘কি ব্যাপার বব?’
—‘নিগ্রোটা,…মারা গেছে!’
—‘হায় ভগবান! কি ভাবে?’
বব মাথা নাড়ল। মিসেস হিগিন্স দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসে ববের ঘরে উঁকি দিলেন।
‘ওহ্ বব, বব, আমি তোমাকে আগেই বলেছিলাম, আমি তোমাকে সাবধান করেছিলাম’, মিসেস হিগিন্স প্রায় কাঁদো কাঁদো। বব কোনো কথা না বলে পকেট থেকে রুমাল বার করল।
‘ধন্যবাদ বব’, রুমালে চোখ মুছে মিসেস হিগিন্স ভালো করে নিগ্রো বুড়োটাকে দেখতে লাগলেন। তারপ সন্তপর্ণে কাছে গিয়ে মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে হাত রাখলেন। মারা গেছে এতে কোনো সন্দেহ নেই।
—‘কি সর্বনাশ বব। এখন কি হবে?’
কিছুই মাথায় আসছিল না ববের। কি জন্য মারা গেল বুড়োটা? বহুদিন না খাওয়ার জন্য! না কি বেজায় ঠান্ডা ওর বুড়ো হাড় নিতে পারে নি। ধীর পায়ে ক্লান্ত ভাবে বিছানায় এসে গা এলিয়ে দিল সে। শেরিফকে বা টহলদার পুলিশের অফিসে খবর পাঠানো যেতে পারে। ওরা হয়তো এসে কিছু একটা ব্যবস্থা করতে পারে।
—‘আমার তা মনে হয় না বব, লোকজানাজানি হলে সরাইখানার সুনামের কি হবে ভেবে দেখেছ একবারও? যীশুর দিব্যি বব, দোহাই ও কাজ কোরো না।’
হতাশ হয়ে বিছানায় বসে রইল বব। ফায়ারপ্লেসের আগুন এখনো জ্বলছে। ঘর এখন বেশ গরম। যদিও বব সেই উত্তাপ উপভোগ করার মতো অবস্থায় নেই। সে ভাবতে লাগল, এসব কিছুই ঘটেনি, নিছকই একটা স্বপ্ন, হয়তো এখুনি সে জেগে উঠে শুনবে সকালের প্রতরাশের জন্য মিসেস হিগিন্স তাকে ডাকাডাকি করছেন।
‘একে তুমি কোথায় পেলে বব?’ মিসেস হিগিন্স একটু সামলেছেন নিজেকে। হলুদ আলোয় তাঁর মুখ বিবর্ণ দেখাচ্ছে।
বিমর্ষ কন্ঠে বব উত্তর দিল, ‘সিটিহল অ্যালির ভিতরে। রাস্তায় ধুঁকছিল। আচ্ছা ওর জামাকাপড় পকেট এসব খুঁজে দেখলে হয় না, যদি কিছু নাম ঠিকানা হাল হদিস পাওয়া যায়?’
‘ওহ্ বব, আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, তুমি এখনো শিশুই রয়ে গেছো। আমি চাই না লোকে ব্যাপারটা জানুক। আজকাল ব্যবসাপাতির অবস্থা তো জানোই, এসব জানতে পারলে শহরে নানারকম গুজব রটবে, তখন…’, মিসেস হিগিন্স ফের ফোঁপাতে লাগলেন।
—‘আমার সহানুভূতি, মিসেস হিগিন্স।’
মিসেস হিগিন্স সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। সামান্য উত্তেজিত। বব লক্ষ্য করল তাঁর হাত কাঁপছে।
‘শোনো, চলো লাশটার কিছু একটা করি। জানাজানি হওয়ার আগেই।’
বব মিসেস হিগিন্সের দিকে চাইল। আপাতনিরীহ ভদ্রমহিলা। সাধারণ বেশবাস। সাতেপাঁচে থাকেন না। প্রত্যেক সন্ধ্যায় মিস্টার হিগিন্সের বিরক্তিকর পিয়ানোর একমাত্র শ্রোতা। বব কখনো তাঁকে জর্জটাউনের ভবিষ্যৎ নিয়ে মতামত দিতেও শোনেনি। সেই মহিলা তাকে সাংঘাতিক একটি কাজ করার পরামর্শ দিচ্ছেন দেখে বব অবাক না হয়ে পারল না।
—‘তুমি কি কাউকে বলেছ, এই নিগ্রোটার কথা?’
বব ইতস্তত করল।
—‘এক সার্জেন্ট, আর মুদীখানার রবিন্স।’
—‘তোমার কান্ডজ্ঞানের তারিফ করতে হয় বাছা। ঈশ্বর কি তোমাকে বুদ্ধি ছাড়া পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন? চারিদিকে কি হচ্ছে তা জানো না?’
বব জানে। গতকালই পোটোম্যাক নদীর ধারে একটা মাছের বোটের ভেতর তিনজন নিগ্রোকে খুন করেছে ওরা। বোটের মালিককেও একই সঙ্গে মেরে নোটিশও লটকেছে।
‘শোনো, আমার কাছে মাংসকাটার বড় ধারালো ছুরি আছে। আমরা ওকে কেটে ছোট ছোট টুকরো করে ফেলতে পারি। তারপর ব্যাগে ভরে কোথাও ফেলে দিতে পারি’, একনিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে মিসেস হিগিন্স ববের দিকে চোখ বড়বড় করে চেয়ে রইলেন। অনুমোদন পাওয়ার অপেক্ষায়।
—‘ওকে টুকরো করবেন?’
—‘ভেবে দেখ বব, কেউ জানতে পারবে না। পুলিশ জিজ্ঞাসা করলে বলবে, শেষবার ওকে তুমি ব্রডওয়ের দিকে যেতে দেখেছ।’
বব ব্যাপারটাতে রাজী হল না। তার ধারণা নিগ্রোটার পিঠের হাড় খুবই শক্ত, সুতরাং ছুরি দিয়ে কাটা যাবে না। চারিদিক রক্তারক্তি হবে।
—‘বব, আমি এসব বরদাস্ত করবো না, এই ঝামেলা তুমি নিয়ে এসেছো, তোমার কি মনে হয় না তোমাকেই ব্যাপারটা সাফ করতে হবে।’
—‘অবশ্যই মিসেস হিগিন্স, আমি মেনে নিচ্ছি এ আমার দোষ। নিজেকে নীচ লাগছে। কেন যে আমি আপনাদের বিব্রত করলাম। ঈশ্বর আমাকে ক্ষমা করবেন না। মনে হচ্ছে সমস্ত সৎ ও ভালো কাজ করার যোগ্যতা আমি হারিয়েছি। যেমন মেরীকে ঘোড়ায় চড়া শেখানো।’
মিসেস হিগিন্সের মুখ পলকে আরক্ত। বব বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। চুল্লীর আগুন আরো একটু উস্কে দিয়ে সে জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়ালো। বাইরে অবিশ্রান্ত বরফ পড়ছে। তার বহুদিনের সঙ্গী জানালার পাশের ইউক্যালিপ্টাস গাছের পাতার সবুজ রঙ প্রায় অন্তর্হিত। এক বিরাট ক্রিসমাস ট্রী যেন।
—‘কোনো মতলব বব?’
মিসেস হিগিন্সের দিকে ঘুরে দাঁড়াল বব। মহিলা দরজার ধার ঘেঁষে রাগত মুখে তাকিয়ে আছেন। তাঁর সামনেই নিগ্রোটার মৃতদেহ। বব ভাবল, ইস্ ও যদি জানতে পারত ও হেভেনে কয়েক টুকরো অবস্থায় যাবে তাহলে এইভাবে মরার ঝুঁকি নিত না। নিগ্রোটার দিকে চেয়ে বব নিচু গলায় বলল,
—‘শুনুন, সার্জেন্ট র্যামোস আমাকে একটা পরামর্শ দিয়েছিল, বুড়োটাকে রাস্তার মোড়ের জঞ্জালের উপর ছুঁড়ে ফেলতে।’
‘তবে তাই কর না কেন?’, মিসেস হিগিন্স উৎসাহিত হলেন।
—‘দেখুন, আমার মনে হয় ওর পরিবার ইত্যাদির খোঁজ একবার করা উচিত। তাহলে বিবেকের কাছে —’
—‘তোমাকে পরিষ্কার বলছি বব। জর্জটাউনে যারা ছুটি কাটাতে আসে তারা আমার সরাইখানা ভীষণ পছন্দ করে কারণ এখানে গোলমাল হয় না, এখন যদি এসব…’
মিসেস হিগিন্সকে হাত তুলে থামিয়ে দিল বব। সে জানে ওঁর আপত্তি যুক্তিসঙ্গত। আশ্বস্ত করে সে মিসেস হিগিন্সকে চিন্তামুক্ত হওয়ার অনুরোধ জানাল, কেননা সকাল হওয়ার আগেই সে বুড়োকে জঞ্জালের স্তূপে ছুঁড়ে ফেলে আসবে।
—‘সব কিছু ঠিক আছে তো বব? আমি কিছু সাহায্য করতে পারি?’
—‘ধন্যবাদ, মিসেস হিগিন্স, আশা করব কাল সকালের আগে আপনার দরকার পড়বে না।’
‘দেখো বব’, মিসেস হিগিন্স হাতের কাজ থামালেন, ‘আমি চাই না তুমি কোনো ঝামেলায় জড়াও। আমার মনে হয় বুড়োটাকে যত তাড়াতাড়ি পারা যায় বিদায় করাই ভালো।’
বব মাথা নীচু করে বলল, ‘আমি অবশ্যই চেষ্টা করব। আশা করছি কাল সকালে—’
—‘দেখ আমাকে পাদ্রীসাহেব বলেছেন, এরা ভীষণ অকৃতজ্ঞ হয়। তাছাড়া কানাঘুষোয় শোনা যাচ্ছে যে নিগাররা নাকি বলশেভিকদের দেখাদেখি গোলমাল করার চেষ্টা করছে। শুনছি সরকার থেকে প্রচুর ধরপাকড় আরম্ভ হয়েছে। কাগজে কি লিখেছে শোনো, ‘আমেরিকা আমেরিকানদের জন্য’।’
—‘আমি বিস্মিত হলাম মিসেস হিগিন্স, তবে এ লোকটা নেহাতই গোবেচারা।’
‘তাই যেন হয় বব, তবে আমার কথাটা মনে রেখো’, মিসেস হিগিন্স উঠে দাঁড়ালেন, ‘শুভরাত্রি বব।’
—‘শুভরাত্রি মিসেস হিগিন্স।’
বব বিষন্ন মনে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে নিজের ঘরের দরজার হাতল ঘোরালো। নিগ্রোটার হুঁশ ফিরেছে কি? মাংসের টুকরোটা কি খেয়েছে ও?
দরজা খুলে ঘরে ঢুকতেই একরাশ চমক ববের জন্য অপেক্ষা করছিল। এ চমক ক্রিসমাসের উপহার পাওয়ার আনন্দের মতো নয়, বা কয়লাখনির ভিতর পাথর খুঁড়ে হঠাৎ একটুকরো হীরে পাওয়ার উত্তেজনার মতোও নয়, এ অন্যরকম অনুভুতি। শীতের রাতে প্রথম তুষারপাতের পর সকালে ঘুম থেকে উঠেই কোন ঘুঘু পাখিকে জানালার পাশে মরে পড়ে থাকতে দেখার মতো। বব প্রথমে ব্যাপারটা ঠিক অনুধাবন করতে পারেনি। কিন্তু মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে থাকা নিস্পন্দিত দেহ, নিস্পলক চোখ, মুখের কষ বেয়ে নামা ফেনা, হাত থেকে ছিটকে পড়া মাংসের টুকরো ববকে প্রায় ঘাড় ধরে বুঝিয়ে দিল যে সে এই মুহূর্তে একটি নিগ্রো মানুষের মৃতদেহের দিকে চেয়ে আছে।
হা ঈশ্বর! বব মৃদু স্বরে ডুকরে উঠল। ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে নিগ্রো বুড়োটার গায়ে পা দিয়ে একটু খোঁচা মারল সে। দেহটা নড়ল না, কোনো সন্দেহ নেই এতক্ষণে বুড়ো স্বর্গে পৌঁছেছে। অবশ্য ওর গায়ের রঙ তো কালো, ওরও কি স্বর্গে যাওয়ার কথা?
ও হয়তো উঠে এসে মাংসটা খাওয়ার চেষ্টা করেছিল, সিদ্ধান্ত করল বব। বহুদিনের অভুক্ত শরীর আর সইতে পারে নি। হয়তো শেষ মুহূর্তে ঐ মাংসের টুকরোর দিকে চেয়েই ও মারা গেছে। এমনও হতে পারে যে ও ববকে ডাকার চেষ্টা করেছিলো। হয়তো নিচের তলায় মিসেস হিগিন্স ওর আর্তনাদ শুনতে পাননি। তাছাড়া শুনতে পেলেও কোনোও লাভ হত কি?
কিন্তু এবার কি হবে? বব শিউরে উঠল। এই নিগ্রোটার মৃতদেহ নিয়ে কি করবে সে এখন? ভয়ভাবনায় তার কান্ডজ্ঞান লোপ পাচ্ছে। তড়িঘড়ি সে সিঁড়ির উপর থেকে চিৎকার করে মিসেস হিগিন্সকে ডাকল। অবশ্য খুব জোরে চেঁচাতে সে সাহস পেল না কারণ সে চাইছিল না অন্য বোর্ডাররা ব্যাপারটা জানুক।
মিসেস হিগিন্স রাতপোশাকের উপর একটা ওভারকোট মতন চড়িয়ে হলঘরে বেরিয়ে এলেন।
—‘কি ব্যাপার বব?’
—‘নিগ্রোটা,…মারা গেছে!’
—‘হায় ভগবান! কি ভাবে?’
বব মাথা নাড়ল। মিসেস হিগিন্স দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসে ববের ঘরে উঁকি দিলেন।
‘ওহ্ বব, বব, আমি তোমাকে আগেই বলেছিলাম, আমি তোমাকে সাবধান করেছিলাম’, মিসেস হিগিন্স প্রায় কাঁদো কাঁদো। বব কোনো কথা না বলে পকেট থেকে রুমাল বার করল।
‘ধন্যবাদ বব’, রুমালে চোখ মুছে মিসেস হিগিন্স ভালো করে নিগ্রো বুড়োটাকে দেখতে লাগলেন। তারপ সন্তপর্ণে কাছে গিয়ে মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে হাত রাখলেন। মারা গেছে এতে কোনো সন্দেহ নেই।
—‘কি সর্বনাশ বব। এখন কি হবে?’
কিছুই মাথায় আসছিল না ববের। কি জন্য মারা গেল বুড়োটা? বহুদিন না খাওয়ার জন্য! না কি বেজায় ঠান্ডা ওর বুড়ো হাড় নিতে পারে নি। ধীর পায়ে ক্লান্ত ভাবে বিছানায় এসে গা এলিয়ে দিল সে। শেরিফকে বা টহলদার পুলিশের অফিসে খবর পাঠানো যেতে পারে। ওরা হয়তো এসে কিছু একটা ব্যবস্থা করতে পারে।
—‘আমার তা মনে হয় না বব, লোকজানাজানি হলে সরাইখানার সুনামের কি হবে ভেবে দেখেছ একবারও? যীশুর দিব্যি বব, দোহাই ও কাজ কোরো না।’
হতাশ হয়ে বিছানায় বসে রইল বব। ফায়ারপ্লেসের আগুন এখনো জ্বলছে। ঘর এখন বেশ গরম। যদিও বব সেই উত্তাপ উপভোগ করার মতো অবস্থায় নেই। সে ভাবতে লাগল, এসব কিছুই ঘটেনি, নিছকই একটা স্বপ্ন, হয়তো এখুনি সে জেগে উঠে শুনবে সকালের প্রতরাশের জন্য মিসেস হিগিন্স তাকে ডাকাডাকি করছেন।
‘একে তুমি কোথায় পেলে বব?’ মিসেস হিগিন্স একটু সামলেছেন নিজেকে। হলুদ আলোয় তাঁর মুখ বিবর্ণ দেখাচ্ছে।
বিমর্ষ কন্ঠে বব উত্তর দিল, ‘সিটিহল অ্যালির ভিতরে। রাস্তায় ধুঁকছিল। আচ্ছা ওর জামাকাপড় পকেট এসব খুঁজে দেখলে হয় না, যদি কিছু নাম ঠিকানা হাল হদিস পাওয়া যায়?’
‘ওহ্ বব, আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, তুমি এখনো শিশুই রয়ে গেছো। আমি চাই না লোকে ব্যাপারটা জানুক। আজকাল ব্যবসাপাতির অবস্থা তো জানোই, এসব জানতে পারলে শহরে নানারকম গুজব রটবে, তখন…’, মিসেস হিগিন্স ফের ফোঁপাতে লাগলেন।
—‘আমার সহানুভূতি, মিসেস হিগিন্স।’
মিসেস হিগিন্স সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। সামান্য উত্তেজিত। বব লক্ষ্য করল তাঁর হাত কাঁপছে।
‘শোনো, চলো লাশটার কিছু একটা করি। জানাজানি হওয়ার আগেই।’
বব মিসেস হিগিন্সের দিকে চাইল। আপাতনিরীহ ভদ্রমহিলা। সাধারণ বেশবাস। সাতেপাঁচে থাকেন না। প্রত্যেক সন্ধ্যায় মিস্টার হিগিন্সের বিরক্তিকর পিয়ানোর একমাত্র শ্রোতা। বব কখনো তাঁকে জর্জটাউনের ভবিষ্যৎ নিয়ে মতামত দিতেও শোনেনি। সেই মহিলা তাকে সাংঘাতিক একটি কাজ করার পরামর্শ দিচ্ছেন দেখে বব অবাক না হয়ে পারল না।
—‘তুমি কি কাউকে বলেছ, এই নিগ্রোটার কথা?’
বব ইতস্তত করল।
—‘এক সার্জেন্ট, আর মুদীখানার রবিন্স।’
—‘তোমার কান্ডজ্ঞানের তারিফ করতে হয় বাছা। ঈশ্বর কি তোমাকে বুদ্ধি ছাড়া পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন? চারিদিকে কি হচ্ছে তা জানো না?’
বব জানে। গতকালই পোটোম্যাক নদীর ধারে একটা মাছের বোটের ভেতর তিনজন নিগ্রোকে খুন করেছে ওরা। বোটের মালিককেও একই সঙ্গে মেরে নোটিশও লটকেছে।
‘শোনো, আমার কাছে মাংসকাটার বড় ধারালো ছুরি আছে। আমরা ওকে কেটে ছোট ছোট টুকরো করে ফেলতে পারি। তারপর ব্যাগে ভরে কোথাও ফেলে দিতে পারি’, একনিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে মিসেস হিগিন্স ববের দিকে চোখ বড়বড় করে চেয়ে রইলেন। অনুমোদন পাওয়ার অপেক্ষায়।
—‘ওকে টুকরো করবেন?’
—‘ভেবে দেখ বব, কেউ জানতে পারবে না। পুলিশ জিজ্ঞাসা করলে বলবে, শেষবার ওকে তুমি ব্রডওয়ের দিকে যেতে দেখেছ।’
বব ব্যাপারটাতে রাজী হল না। তার ধারণা নিগ্রোটার পিঠের হাড় খুবই শক্ত, সুতরাং ছুরি দিয়ে কাটা যাবে না। চারিদিক রক্তারক্তি হবে।
—‘বব, আমি এসব বরদাস্ত করবো না, এই ঝামেলা তুমি নিয়ে এসেছো, তোমার কি মনে হয় না তোমাকেই ব্যাপারটা সাফ করতে হবে।’
—‘অবশ্যই মিসেস হিগিন্স, আমি মেনে নিচ্ছি এ আমার দোষ। নিজেকে নীচ লাগছে। কেন যে আমি আপনাদের বিব্রত করলাম। ঈশ্বর আমাকে ক্ষমা করবেন না। মনে হচ্ছে সমস্ত সৎ ও ভালো কাজ করার যোগ্যতা আমি হারিয়েছি। যেমন মেরীকে ঘোড়ায় চড়া শেখানো।’
মিসেস হিগিন্সের মুখ পলকে আরক্ত। বব বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। চুল্লীর আগুন আরো একটু উস্কে দিয়ে সে জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়ালো। বাইরে অবিশ্রান্ত বরফ পড়ছে। তার বহুদিনের সঙ্গী জানালার পাশের ইউক্যালিপ্টাস গাছের পাতার সবুজ রঙ প্রায় অন্তর্হিত। এক বিরাট ক্রিসমাস ট্রী যেন।
—‘কোনো মতলব বব?’
মিসেস হিগিন্সের দিকে ঘুরে দাঁড়াল বব। মহিলা দরজার ধার ঘেঁষে রাগত মুখে তাকিয়ে আছেন। তাঁর সামনেই নিগ্রোটার মৃতদেহ। বব ভাবল, ইস্ ও যদি জানতে পারত ও হেভেনে কয়েক টুকরো অবস্থায় যাবে তাহলে এইভাবে মরার ঝুঁকি নিত না। নিগ্রোটার দিকে চেয়ে বব নিচু গলায় বলল,
—‘শুনুন, সার্জেন্ট র্যামোস আমাকে একটা পরামর্শ দিয়েছিল, বুড়োটাকে রাস্তার মোড়ের জঞ্জালের উপর ছুঁড়ে ফেলতে।’
‘তবে তাই কর না কেন?’, মিসেস হিগিন্স উৎসাহিত হলেন।
—‘দেখুন, আমার মনে হয় ওর পরিবার ইত্যাদির খোঁজ একবার করা উচিত। তাহলে বিবেকের কাছে —’
—‘তোমাকে পরিষ্কার বলছি বব। জর্জটাউনে যারা ছুটি কাটাতে আসে তারা আমার সরাইখানা ভীষণ পছন্দ করে কারণ এখানে গোলমাল হয় না, এখন যদি এসব…’
মিসেস হিগিন্সকে হাত তুলে থামিয়ে দিল বব। সে জানে ওঁর আপত্তি যুক্তিসঙ্গত। আশ্বস্ত করে সে মিসেস হিগিন্সকে চিন্তামুক্ত হওয়ার অনুরোধ জানাল, কেননা সকাল হওয়ার আগেই সে বুড়োকে জঞ্জালের স্তূপে ছুঁড়ে ফেলে আসবে।
No comments:
Post a Comment