Thursday, 15 December 2011

বব উইলিস ও একটি কালো কোটের গল্প- পর্ব ১

     গোটা শীতকালটাই বব বেশ ঝিমিয়ে কাটায়। ঘরের জানালা দিয়ে উদাস চোখে বাইরের বরফ পড়া দেখা ছাড়া তার কাজ বলতে শুধু খাওয়া এবং ঘুম। সন্ধ্যার দিকে অবশ্য সে চেস্টারের বিয়ার পাবে কদাচিৎ যায়। কদাচিৎ, কারণ জর্জটাউনের লম্বা চুলওলা মেয়েদের সে দু’চক্ষে দেখতে পারে না। সে জানে তার এই আয়েশি চালচলন বাড়িওয়ালা মিঃ হিগিন্‌সের পছন্দ নয়। তবে যেহেতু সে মাসপয়লা বাড়িভাড়া অন্য ভাড়াটেদের তুলনায় আগে দেয়, এবং প্রাতরাশের টেবিলে মিসেস হিগিন্‌সের লেস দিয়ে বোনা ফ্রেঞ্চ গাউনের প্রশংসা করে, তাই হিগিন্‌স তাকে কিছু বলে না। উপরন্তু মাঝেসাঝে তার জন্য এক বালতি বেশী গরম জল রেখে দেয়। প্রতিদানে, কখনো কখনো সে ক্রাম্যার্স লেন ধরে ব্রডওয়ের দিকে টহল দিতে গেলে, হিগিন্‌স দম্পতির জন্য মিষ্টি রুটিও কিনে আনে। তবে শীতকালে তার প্রথম পছন্দ বেকার্স ইনের কেক। ক্যান্টারবেরির কেকও তার ভালো লাগে তবে ওতে স্ট্রবেরি থাকে না।
     আমাদের গল্পের নায়ক বব উইলিস কোনো ভবঘুরে নয়। সে জর্জটাউন কোলিয়ারীর শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা। অবশ্য এর মানে এই নয় যে সে উডল্যান্ড পার্কে দাঁড়িয়ে, চোঙা হাতে, কোলিয়ারীতে কেন বছরে মাত্র দু’শ চৌত্রিশ দিন কাজ দেওয়া হবে, তার বিরুদ্ধে জোরদার সওয়াল করতে পারে। ওহাইয়ো আর মিসিসিপিতে যে শ্রমিকদের দ্বিগুণ মাইনে দেওয়া হয় এ খবরটাও সে জানে না। যেমন জানে না, হিগিন্‌সের বোনঝি মিস আন্যাবেল মেরী ক্যারোলাইনার দাঁতে ব্রেস রয়েছে। তবুও তাকে ইউনিয়নের নেতা বানানো হয়েছে, তার কারণ মালিকের মেয়ের সাথে তার একটু বেশীই খাতির।
     এমনিতে বব ছেলে ভালো। তার বাপ যখন তাকে হাইস্কুলের পাট চুকিয়ে কোলিয়ারীতে কাজে ঢোকালো তখন সে মোটেই আপত্তি জানায়নি। বরং প্রথম মাইনে পেয়ে সে একটা ছিপ কিনে সাত পাউন্ডের স্যালমন মাছ অবধি ধরতে পেরেছিল। মাসের প্রথমদিকে বন্ধুবান্ধবের পেছনে সে অকাতরে পয়সা ঢালে, যে কারণে বন্ধুরা তাকে খাতির করে ডাকে ‘আমুদে বব’ বলে। তবে তার সবথেকে ভালো লাগে কেন্টাকি ব্যালে থিয়েটার, বিশেষ করে ওর টিকিট মাস্টার বুড়ো বেনসন্‌কে। প্রতি রবিবার গীর্জাতে সে বুড়োর জন্য চুরুট নিয়ে যায়। আরাম করে বেঞ্চে বসে দু’জনে মিলে খোশগল্প করে। উত্তরে হ্যামন্ড শহরে চিংড়ীমাছের ব্যবসা খোলার বুদ্ধিটা বেনসন্‌ই ওকে দিয়েছিলো।
     ইদানীং কোলিয়ারীর অবস্থা খুব খারাপ। টন পিছু মজুরির হিসেব অনুযায়ী শ্রমিকদের যা পাওয়ার কথা তার অর্দ্ধেকও তারা পাচ্ছে না। কানাঘুষোয় শোনা যাচ্ছে জ্যাকসনভিল এগ্রীমেন্ট অনুযায়ী কোলিয়ারী নাকি বন্ধ হয়ে যাবে। মজুরি কম পাওয়ায় কেউ আর কাজ করতেও চায় না। পুরোনো বাসিন্দারা সব এক এক করে সম্পত্তি বেচে চলে যাচ্ছে। গত গ্রীষ্মে সার্কাসও তেমন জমেনি। তবে ববের এসবে কিছু যায় আসে না, তার সকাল সন্ধে রুটি আর মদ হলেই চলে যায়।
     আমাদের গল্প শুরু হচ্ছে নভেম্বরের কোনো এক শীতের সন্ধ্যাবেলায় ক্রাম্যার্স লেনের সরাইখানাটির দোতলার এক ছোট্ট জানালা থেকে। ঐ জানালার পাশেই ববের প্রিয় ইজিচেয়ারটি রাখা। ওতে বসে বব একমনে পাশের বাড়ির চুল্লীটার ধীরে ধীরে বরফে ঢেকে যাওয়া দেখছিল। নীচে রাস্তাঘাট একরকম শুনশান। ক্রমশ পশমের তুলোর মতোন হাল্কা ছাইরঙা বরফে সবকিছু ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।
     আজ বব সারাদিন প্রায় ঘুমিয়ে কাটিয়েছে। একবারমাত্র কিছুক্ষণের জন্য সে ইউনিয়নের মাসিক পত্রিকা পড়ার চেষ্টা করছিল। বিশেষ করে, ‘রবিবার সন্ধ্যা’-র কলামটা যেখানে একগুঁয়ে টমাসের বউ নানান মুখরোচক হুজুগের হালহদিস দেয়। এছাড়া সে পড়েছে পাদ্রী সাহেবের গীর্জাসংক্রান্ত নানান ঐশ্বরিক চিন্তাভাবনা, কিংবা শহরের পুরোনো বাড়ি কেনাবেচার গল্প। অবশ্য ইউনিয়নের দাবিসনদ জাতীয় জটিল বিষয় সে ছুঁয়েও দেখেনি। তবে সবকিছুই তার বিরক্তিকর লাগছিল কারণ হ্যামন্ডে মাছের ব্যবসার বাজার কেমন, সেসব কিছুই এইধরনের পত্রিকায় পাওয়া যায় না।
     চুল্লীটার প্রায় পুরোটাই বরফে ঢেকে যাওয়ার পর ববের মনে হল জর্জটাউনে সে অনেককাল কাটিয়ে ফেলেছে। প্রতিসন্ধ্যায় হিগিন্‌সের পিয়ানোর বিরক্তিকর টুংটাং শোনার মতোই শহরটা একঘেয়ে। কোনো নতুনত্ব নেই। এমনকি ব্রডওয়ের ধারে জামাকাপড়ের দোকানের নতুন মালিকের বউও সেই একই মেরি উইডো হ্যাট পরে। বব দ্রুত ঠিক করল শীতের শেষে সে উত্তরের দিকে চলে যাবে। কোনো বন্দরে চাকরি নেবে। খালাসি কিংবা নাবিকের চাকরি হলে বেশ হয়। মাইনেপত্তর ভালো, তাছাড়া একঘেয়েমিটাও কাটবে। তারপর না হয় হাতে পয়সাকড়ি এলে সুবিধামতন টাটকা মাছের ব্যবসা খুলে জাঁকিয়ে বসা যাবে। বন্দর শহরের সুবিধা হল ওগুলো কখনো পুরোনো স্যাঁতস্যাঁতে হয় না।
     এইসব ভেবে বব একটু নড়েচড়ে বসল। সারাদিন ঝিমিয়ে থাকার পর একটু উত্তেজিত হওয়ার মতন রসদ পাওয়া গেছে। আলমারি খুলে সে বার করল উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া একটা কাঠের বাক্স। খবরের কাগজের কাটিং, কিছু ডলারের নোট, খুচরো পয়সা, পারফিউমের শিশি ও আরও নানান টুকিটাকিতে যেটা প্রায় ভর্তি। আতিপাতি খুঁজে সে বের করল বহুদিন আগেকার বিজ্ঞাপনের কাটিং। ছোট্ট একফালি বিজ্ঞাপন। বন্দরের কর্মকর্তারা যেমন ডকইয়ার্ডে সাফাই কর্মীনিয়োগের জন্য দায়সারা গোছের নোটিশ লটকায়, অনেকটা সেরকম। বব যত্ন করে সেটাকে থুতু দিয়ে দেওয়ালে সেঁটে বিছানার উপর শুয়ে শুয়ে লক্ষ্য করতে লাগল।
‘এই রকম কিছু একটা আমার দরকার।’, বিড়বিড় করে বলে উঠল সে। ‘অবশ্য মাইনেটাও দেখতে হবে। তবে ঝাড়ুদার হিসেবে চাইলে ওরা বব উইলিসকে পাবে না। নাবিকের কাজই আমি ভাল পারব। হয়তো ওরা আমার কাজ দেখে মেট্‌ও করে দিতে পারে। ওঃ কি তোফা থাকা যাবে! দু’মাস অন্তর নতুন জায়গা, নতুন মদ, ডকইয়ার্ডে নতুন নতুন সব লোকজন, জাহাজঘাটার একপাশে শেডের ভিতর অফিসারদের ক্যান্টিন, দিলদরিয়া মেজাজের শিপমেটের চিৎকার, ‘এই বব, কম্পাস দেখ, নোঙর ফেল,’ টি আং লিং, আ হয় ক্যাপ্টেন, টি আং লিং…’
বব উইলিস পৃথিবীর অন্য সব উচ্চাভিলাষী যুবকের মত নয়, তাই সে এরপর দক্ষিণদেশীয় কোন ধনী মেয়েকে বিয়ে করে কাচ্চাবাচ্চার স্বপ্ন মোটেই দেখল না, বরং ফুর্তির চোটে বোতলটা শেষ করে চটজলদি স্থির করল চেস্টারের পাবে একবার ঢুঁ মারবে। ওখানে আজ বেনসনের আসার কথা। ওর সাথে পরামর্শ করতে হবে।
     বাইরে এখনো ক্রমাগত বরফ পড়ে চলেছে। প্রায়ান্ধকার রাস্তায় দু’ধারের গ্যাসবাতিগুলো এখনো জ্বলেনি। পথচলতি মানুষজন ঠান্ডার চোটে আপাদপমস্তক ঢাকা। গরম জামা, জুতো, মোজা, দস্তানা, টুপি, ওভারকোট চড়িয়ে ঘরের দরজা খুলতেই বব শুনতে পেল একতলায় হিগিন্‌সের বৈঠকখানায় পিয়ানোর রেওয়াজ শুরু হয়েছে।

No comments:

Post a Comment